Dhaka মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তেলের ধাক্কা: সত্তরের সংকট থেকে আজকের শঙ্কা

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৩:৫৬:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১১১ বার দেখা হয়েছে

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি অনিশ্চয়তা আবারও আলোচনায়। গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বিঘ্ন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, আর তেলের বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে নতুন করে ফিরে আসছে পুরোনো এক স্মৃতি: সত্তরের দশকের তেল সংকট। প্রশ্ন উঠছে, ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছে?

  • এক সিদ্ধান্ত, বিশ্বজুড়ে ধাক্কা

১৯৭৩ সাল। মধ্যপ্রাচ্যে Yom Kippur War শুরু হতেই বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ালে পাল্টা পদক্ষেপ নেয় আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। OPEC–এর নেতৃত্বে আরোপ করা হয় তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা।

একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই মুহূর্তে বদলে দেয় বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি। তেলের সরবরাহ কমে যায়, আর বাজারে শুরু হয় দামের উল্লম্ফন।

  • পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ—সবখানেই একই দৃশ্য। পেট্রোল পাম্পের সামনে সারি সারি গাড়ি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। অনেক দেশে চালু হয় ‘অড-ইভেন’ পদ্ধতি—একদিন জোড় নম্বর, আরেকদিন বিজোড় নম্বরের গাড়ি চলবে।

জার্মানিতে রবিবার গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। শহরের ব্যস্ত সড়কগুলো হঠাৎই ফাঁকা হয়ে পড়ে—যেন এক অচেনা পৃথিবী।

  • মূল্যস্ফীতি আর স্থবিরতার যুগ

তেলের দাম চার গুণ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ে প্রতিটি খাতে। উৎপাদন খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, আর সেই চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

অর্থনীতিতে জন্ম নেয় এক নতুন শব্দ—স্ট্যাগফ্লেশন। যেখানে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বও তখন বুঝতে পারে, জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

  • শক্তির রাজনীতির নতুন মানচিত্র

এই সংকটের পর বদলে যায় বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো হয়ে ওঠে আরও প্রভাবশালী। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে—নিউক্লিয়ার শক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এমনকি জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির উন্নয়নেও জোর বাড়ে।

একই সঙ্গে অনেক দেশ গড়ে তোলে কৌশলগত তেল মজুত, যাতে ভবিষ্যতে এমন ধাক্কা সামাল দেওয়া যায়।

  • আজকের বিশ্ব, কতটা প্রস্তুত?

বর্তমান বিশ্ব অবশ্য সত্তরের দশকের মতো একমুখী নয়। তেলের উৎস এখন বহুমুখী, প্রযুক্তি উন্নত, আর জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এসেছে বৈচিত্র্য। তবু ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সতর্কবার্তা বলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আবারও বড় হুমকির মুখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হলে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

  • ইতিহাসের শিক্ষা

সত্তরের দশকের তেল সংকট শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি শিক্ষা। বিশ্ব তখন বুঝেছিল—জ্বালানি শুধু পণ্য নয়, এটি শক্তি, রাজনীতি এবং নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু।

আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই শিক্ষাই আবার সামনে আসছে। প্রশ্ন শুধু একটাই—বিশ্ব কি এবার প্রস্তুত? নাকি আবারও অপেক্ষা করছে আরেকটি তেলের ধাক্কা?

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

তেলের ধাক্কা: সত্তরের সংকট থেকে আজকের শঙ্কা

প্রকাশের সময় ০৩:৫৬:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি অনিশ্চয়তা আবারও আলোচনায়। গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বিঘ্ন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, আর তেলের বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে নতুন করে ফিরে আসছে পুরোনো এক স্মৃতি: সত্তরের দশকের তেল সংকট। প্রশ্ন উঠছে, ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছে?

  • এক সিদ্ধান্ত, বিশ্বজুড়ে ধাক্কা

১৯৭৩ সাল। মধ্যপ্রাচ্যে Yom Kippur War শুরু হতেই বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ালে পাল্টা পদক্ষেপ নেয় আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। OPEC–এর নেতৃত্বে আরোপ করা হয় তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা।

একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই মুহূর্তে বদলে দেয় বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি। তেলের সরবরাহ কমে যায়, আর বাজারে শুরু হয় দামের উল্লম্ফন।

  • পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ—সবখানেই একই দৃশ্য। পেট্রোল পাম্পের সামনে সারি সারি গাড়ি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। অনেক দেশে চালু হয় ‘অড-ইভেন’ পদ্ধতি—একদিন জোড় নম্বর, আরেকদিন বিজোড় নম্বরের গাড়ি চলবে।

জার্মানিতে রবিবার গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। শহরের ব্যস্ত সড়কগুলো হঠাৎই ফাঁকা হয়ে পড়ে—যেন এক অচেনা পৃথিবী।

  • মূল্যস্ফীতি আর স্থবিরতার যুগ

তেলের দাম চার গুণ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ে প্রতিটি খাতে। উৎপাদন খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, আর সেই চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

অর্থনীতিতে জন্ম নেয় এক নতুন শব্দ—স্ট্যাগফ্লেশন। যেখানে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বও তখন বুঝতে পারে, জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

  • শক্তির রাজনীতির নতুন মানচিত্র

এই সংকটের পর বদলে যায় বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো হয়ে ওঠে আরও প্রভাবশালী। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে—নিউক্লিয়ার শক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এমনকি জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির উন্নয়নেও জোর বাড়ে।

একই সঙ্গে অনেক দেশ গড়ে তোলে কৌশলগত তেল মজুত, যাতে ভবিষ্যতে এমন ধাক্কা সামাল দেওয়া যায়।

  • আজকের বিশ্ব, কতটা প্রস্তুত?

বর্তমান বিশ্ব অবশ্য সত্তরের দশকের মতো একমুখী নয়। তেলের উৎস এখন বহুমুখী, প্রযুক্তি উন্নত, আর জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এসেছে বৈচিত্র্য। তবু ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সতর্কবার্তা বলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আবারও বড় হুমকির মুখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হলে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

  • ইতিহাসের শিক্ষা

সত্তরের দশকের তেল সংকট শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি শিক্ষা। বিশ্ব তখন বুঝেছিল—জ্বালানি শুধু পণ্য নয়, এটি শক্তি, রাজনীতি এবং নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু।

আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই শিক্ষাই আবার সামনে আসছে। প্রশ্ন শুধু একটাই—বিশ্ব কি এবার প্রস্তুত? নাকি আবারও অপেক্ষা করছে আরেকটি তেলের ধাক্কা?