Dhaka শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘মিডলমার্চ’ মানুষের ভেতরের পৃথিবীকে পড়তে শেখায়

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ১০:৫৬:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
  • / ৯৬ বার দেখা হয়েছে

একটি ছোট শহর। কিছু মানুষ। তাদের স্বপ্ন, ভুল, প্রেম, হতাশা আর আত্মসংগ্রামের গল্প। শুনতে সাধারণ মনে হলেও এই সাধারণতার ভেতরেই অসাধারণ এক সাহিত্যজগৎ নির্মাণ করেছিলেন ইংরেজ লেখিকা জর্জ এলিয়ট। তাঁর লেখা ‘মিডলমার্চ’ আজও বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত।

সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান পরিচালিত এক জরিপে বহু লেখক, সমালোচক ও গবেষকের ভোটে ‘মিডলমার্চ’কে সর্বকালের সেরা ইংরেজি ভাষার উপন্যাস হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। যদিও সাহিত্যের পাঠকদের কাছে এই স্বীকৃতি নতুন কিছু নয়। প্রকাশের দেড় শতাব্দী পরও উপন্যাসটি পাঠকের মনে একই রকম গভীর আলোড়ন তোলে।

ভালোবাসার গল্প নয়, জীবনের গল্প: ‘মিডলমার্চ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭১ থেকে ১৮৭২ সালের মধ্যে ধারাবাহিক কিস্তিতে। সে সময় ইংরেজি সাহিত্যে প্রেম ও বিয়েকেন্দ্রিক উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু জর্জ এলিয়ট ভিন্ন পথে হাঁটলেন। তিনি এমন এক গল্প লিখলেন, যেখানে বিয়ে সুখের সমাপ্তি নয়; বরং অনেক সময় তা হয়ে ওঠে নতুন সংকটের শুরু।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডরোথিয়া ব্রুক। বয়স মাত্র উনিশ। আদর্শবাদী, সংবেদনশীল এবং জীবনে বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জ্বল এক তরুণী। কিন্তু সমাজ তখন নারীদের জন্য খুব কম সুযোগই রাখত। ডরোথিয়া বিশ্বাস করেন, বয়স্ক পণ্ডিত কাসাবনের সঙ্গে বিয়ে তাঁকে মহৎ জীবনের পথে নিয়ে যাবে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, বাস্তবতা তাঁর কল্পনার মতো নয়।

এই চরিত্রের মধ্য দিয়েই এলিয়ট নারীর অন্তর্জগতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। সমালোচকদের মতে, ডরোথিয়া শুধু একটি চরিত্র নন; তিনি ইংরেজি সাহিত্যে আধুনিক নারীচরিত্রের সূচনা।

সমাজ বদলের সময়ের উপন্যাস: ‘মিডলমার্চ’-এর পটভূমি ১৮৩০-এর দশকের ইংল্যান্ড। তখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। শিল্পায়ন এগোচ্ছে, রেলপথ বিস্তার লাভ করছে, পুরোনো সামাজিক কাঠামো নড়বড়ে হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের সময়ে মানুষ কীভাবে নিজেদের জায়গা খুঁজে নিতে চায়, সেই চিত্রই উঠে এসেছে উপন্যাসে।

তবে জর্জ এলিয়টের বিশেষত্ব কেবল সমাজচিত্রে নয়। তিনি মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্বকে এমন সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন, যা আজও বিস্ময় জাগায়। তাঁর চরিত্ররা নিখুঁত নয়। তারা ভুল করে, ভেঙে পড়ে, আবার নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সেই কারণেই ‘মিডলমার্চ’-এর মানুষগুলো এত বাস্তব মনে হয়।

কেন এখনো প্রাসঙ্গিক: অনেক সাহিত্য সমালোচক মনে করেন, ‘মিডলমার্চ’-এর শক্তি তার মানবিকতায়। এখানে কোনো অতিনাটকীয় ঘটনা নেই, নেই রহস্যের চমক। তবু উপন্যাসটি পাঠককে ধরে রাখে মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীর পর্যবেক্ষণের কারণে।

লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ একবার বলেছিলেন, ‘মিডলমার্চ’ হচ্ছে “প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য লেখা অল্প কয়েকটি ইংরেজি উপন্যাসের একটি।” অন্যদিকে মার্টিন অ্যামিস একে বলেছেন “ত্রুটিহীন উপন্যাস”।

বর্তমান সময়েও ‘মিডলমার্চ’ নতুন করে পড়া হয়। কারণ মানুষের স্বপ্ন, হতাশা, সামাজিক চাপ ও আত্মপরিচয়ের সংকট—এসব আজও বদলায়নি। সময় পাল্টেছে, কিন্তু মানুষের ভেতরের প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে একই।

এক লেখিকার দীর্ঘ ছায়া: জর্জ এলিয়টের আসল নাম মেরি অ্যান ইভান্স। উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে নারী লেখকদের গুরুত্ব কম দেওয়া হতো বলে তিনি পুরুষ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন। তবে তাঁর সাহিত্যিক শক্তি খুব দ্রুতই তাঁকে স্বীকৃতি এনে দেয়।

১৮১৯ সালে জন্ম নেওয়া এই লেখিকা ইংরেজি সাহিত্যে বাস্তববাদী উপন্যাসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর রচনায় যেমন সমাজের ছবি আছে, তেমনি আছে মানুষের নৈতিক সংকট ও সহমর্মিতার গভীর অনুসন্ধান।

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

‘মিডলমার্চ’ মানুষের ভেতরের পৃথিবীকে পড়তে শেখায়

প্রকাশের সময় ১০:৫৬:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

একটি ছোট শহর। কিছু মানুষ। তাদের স্বপ্ন, ভুল, প্রেম, হতাশা আর আত্মসংগ্রামের গল্প। শুনতে সাধারণ মনে হলেও এই সাধারণতার ভেতরেই অসাধারণ এক সাহিত্যজগৎ নির্মাণ করেছিলেন ইংরেজ লেখিকা জর্জ এলিয়ট। তাঁর লেখা ‘মিডলমার্চ’ আজও বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত।

সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান পরিচালিত এক জরিপে বহু লেখক, সমালোচক ও গবেষকের ভোটে ‘মিডলমার্চ’কে সর্বকালের সেরা ইংরেজি ভাষার উপন্যাস হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। যদিও সাহিত্যের পাঠকদের কাছে এই স্বীকৃতি নতুন কিছু নয়। প্রকাশের দেড় শতাব্দী পরও উপন্যাসটি পাঠকের মনে একই রকম গভীর আলোড়ন তোলে।

ভালোবাসার গল্প নয়, জীবনের গল্প: ‘মিডলমার্চ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭১ থেকে ১৮৭২ সালের মধ্যে ধারাবাহিক কিস্তিতে। সে সময় ইংরেজি সাহিত্যে প্রেম ও বিয়েকেন্দ্রিক উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু জর্জ এলিয়ট ভিন্ন পথে হাঁটলেন। তিনি এমন এক গল্প লিখলেন, যেখানে বিয়ে সুখের সমাপ্তি নয়; বরং অনেক সময় তা হয়ে ওঠে নতুন সংকটের শুরু।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডরোথিয়া ব্রুক। বয়স মাত্র উনিশ। আদর্শবাদী, সংবেদনশীল এবং জীবনে বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জ্বল এক তরুণী। কিন্তু সমাজ তখন নারীদের জন্য খুব কম সুযোগই রাখত। ডরোথিয়া বিশ্বাস করেন, বয়স্ক পণ্ডিত কাসাবনের সঙ্গে বিয়ে তাঁকে মহৎ জীবনের পথে নিয়ে যাবে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, বাস্তবতা তাঁর কল্পনার মতো নয়।

এই চরিত্রের মধ্য দিয়েই এলিয়ট নারীর অন্তর্জগতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। সমালোচকদের মতে, ডরোথিয়া শুধু একটি চরিত্র নন; তিনি ইংরেজি সাহিত্যে আধুনিক নারীচরিত্রের সূচনা।

সমাজ বদলের সময়ের উপন্যাস: ‘মিডলমার্চ’-এর পটভূমি ১৮৩০-এর দশকের ইংল্যান্ড। তখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। শিল্পায়ন এগোচ্ছে, রেলপথ বিস্তার লাভ করছে, পুরোনো সামাজিক কাঠামো নড়বড়ে হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের সময়ে মানুষ কীভাবে নিজেদের জায়গা খুঁজে নিতে চায়, সেই চিত্রই উঠে এসেছে উপন্যাসে।

তবে জর্জ এলিয়টের বিশেষত্ব কেবল সমাজচিত্রে নয়। তিনি মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্বকে এমন সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন, যা আজও বিস্ময় জাগায়। তাঁর চরিত্ররা নিখুঁত নয়। তারা ভুল করে, ভেঙে পড়ে, আবার নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সেই কারণেই ‘মিডলমার্চ’-এর মানুষগুলো এত বাস্তব মনে হয়।

কেন এখনো প্রাসঙ্গিক: অনেক সাহিত্য সমালোচক মনে করেন, ‘মিডলমার্চ’-এর শক্তি তার মানবিকতায়। এখানে কোনো অতিনাটকীয় ঘটনা নেই, নেই রহস্যের চমক। তবু উপন্যাসটি পাঠককে ধরে রাখে মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীর পর্যবেক্ষণের কারণে।

লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ একবার বলেছিলেন, ‘মিডলমার্চ’ হচ্ছে “প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য লেখা অল্প কয়েকটি ইংরেজি উপন্যাসের একটি।” অন্যদিকে মার্টিন অ্যামিস একে বলেছেন “ত্রুটিহীন উপন্যাস”।

বর্তমান সময়েও ‘মিডলমার্চ’ নতুন করে পড়া হয়। কারণ মানুষের স্বপ্ন, হতাশা, সামাজিক চাপ ও আত্মপরিচয়ের সংকট—এসব আজও বদলায়নি। সময় পাল্টেছে, কিন্তু মানুষের ভেতরের প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে একই।

এক লেখিকার দীর্ঘ ছায়া: জর্জ এলিয়টের আসল নাম মেরি অ্যান ইভান্স। উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে নারী লেখকদের গুরুত্ব কম দেওয়া হতো বলে তিনি পুরুষ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন। তবে তাঁর সাহিত্যিক শক্তি খুব দ্রুতই তাঁকে স্বীকৃতি এনে দেয়।

১৮১৯ সালে জন্ম নেওয়া এই লেখিকা ইংরেজি সাহিত্যে বাস্তববাদী উপন্যাসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর রচনায় যেমন সমাজের ছবি আছে, তেমনি আছে মানুষের নৈতিক সংকট ও সহমর্মিতার গভীর অনুসন্ধান।