ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ: বিপুল ব্যয়, তবু কেন অনিয়মের অভিযোগ?
হাওরের কান্না: বন্যা, ফসল ও ভবিষ্যৎ (পর্ব–৩)
- প্রকাশের সময় ০৪:২১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
- / ১৭২ বার দেখা হয়েছে
বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল মানেই প্রকৃতির সঙ্গে এক নিত্য লড়াই। বর্ষায় যেখানে বিস্তীর্ণ জলরাশি, শুষ্ক মৌসুমে সেখানেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বোরো ধান উৎপাদনের ক্ষেত্র। এই বৈপরীত্যের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—“ডুবন্ত বাঁধ”। কিন্তু এই বাঁধ নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে—বছরে শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন বারবার অনিয়ম ও দুর্বলতার অভিযোগ?
ডুবন্ত বাঁধ: নামেই পরিচয়
“ডুবন্ত বাঁধ”—নামটি অনেকের কাছেই অপরিচিত।
আসলে এটি হাওরের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত অস্থায়ী মাটির বাঁধ, যা শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানকে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষা করে।
বর্ষা এলে পুরো হাওর পানিতে ভরে যায়, আর সেই সঙ্গে ডুবে যায় এই বাঁধগুলোও। এ কারণেই এর নাম—ডুবন্ত বাঁধ।
স্থায়ী নয় কেন এই বাঁধ?
প্রশ্ন আসে—স্থায়ী ইট-পাথরের বাঁধ কেন নয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের প্রকৃতি নিজেই মৌসুমি পানিনির্ভর। এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করলে—
- স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হতে পারে
- মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়
- প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়
এই বাস্তবতায় পরিবেশ-সহনশীল মাটির অস্থায়ী বাঁধই তুলনামূলক নিরাপদ সমাধান হিসেবে বিবেচিত।
বছরে শত কোটি টাকার ব্যয়
হাওরের এই ডুবন্ত বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়।
- প্রায় ৯০০ থেকে ৯৫০ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত ও সংরক্ষণ
- সহস্রাধিক পিআইসি (Project Implementation Committee) কাজ বাস্তবায়ন করে
- মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা
এই বিশাল ব্যয়ের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—ফলাফল কতটা টেকসই?
নীতিমালা: কাগজে শক্তিশালী কাঠামো
“কাবিটা নীতিমালা–২০২৩” অনুযায়ী ডুবন্ত বাঁধের কাজ ঠিকাদারি পদ্ধতিতে নয়, বরং স্থানীয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়।
এর মূল উদ্দেশ্য— স্থানীয় কৃষক ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে দ্রুত ও কার্যকরভাবে ফসল রক্ষা নিশ্চিত করা।
কারা বাস্তবায়ন করে?
এই কাজের জন্য গঠন করা হয় পিআইসি (PIC)।
এতে থাকেন—
- স্থানীয় কৃষক
- জমির মালিক
- জনপ্রতিনিধি
- সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি
প্রতিটি পিআইসি নির্দিষ্ট একটি বাঁধ বা অংশের দায়িত্ব পালন করে।
তদারকির বহুস্তর ব্যবস্থা
ডুবন্ত বাঁধের কাজে একাধিক পর্যায়ে নজরদারি থাকার কথা—
- বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB): কারিগরি নকশা ও তদারকি
- উপজেলা ও জেলা প্রশাসন: সমন্বয় ও মনিটরিং
- উপজেলা ও জেলা কমিটি: অগ্রগতি মূল্যায়ন
- স্থানীয় মনিটরিং কমিটি: মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ
কাগজে-কলমে এটি একটি শক্তিশালী কাঠামো।
তবুও অভিযোগ কেন?
বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠে—
- কাজ শুরুতে বিলম্ব
- বাঁধ সংলগ্ন জমির মাটি ব্যবহার
- নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়া
- নিম্নমানের নির্মাণ
- তদারকির ঘাটতি
- প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ
অর্থাৎ, সমস্যা নীতিমালায় নয়—বাস্তবায়নে।
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাঁধ নির্মাণ বা মেরামতই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা—
- নদী ও খাল পুনঃখনন
- পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত করা
- বিজ্ঞানভিত্তিক নকশা
- টপ সয়েল ব্যবহার বন্ধ
- কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা
- স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ
- সর্বোপরি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
শেষ কথা
হাওরের কৃষক প্রতি বছর একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন—
বাঁধ টিকবে তো? ফসল বাঁচবে তো?
ডুবন্ত বাঁধ কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি হাজারো কৃষকের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা।
সেই ভরসায় যদি ফাটল ধরে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—
এই বিপুল ব্যয়ের প্রকৃত সুফল কোথায়?
👉 পরবর্তী পর্ব: হাওরে বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

















