Dhaka বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নজরুলের উৎস-পুরুষ

ড. মোহাম্মদ আমীন
  • প্রকাশের সময় ০৬:১৭:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • / ১০৪ বার দেখা হয়েছে

যাঁর অবিশ্বাস্য অবদান দুখুমিয়া নামক একজন পথশিশুকে রুটির দোকানের কর্মচারী হতে উদ্ধার করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় কবি হওয়ার সমুদয় সুযোগ করে দিয়েছেন, তিনি কাজী রফিজ উদ্দিন, সাধারণ্যে যিনি দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন নামে সমধিক পরিচিত। দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন কোনও সাহিত্যকর্ম করেননি, কোনও কাব্য বা উপন্যাসও রচনা করেননি। তবু তিনি বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী ব্যক্তি হিসাবে অক্ষয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন। যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে, ততদিন থাকবে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম এবং ততদিন বেঁচে থাকবেন কাজী রফিজ উদ্দিন। রফিজ উদ্দিন দারোগার এ অবদান পুরো পুলিশ বিভাগের বিমল গর্ব। সেদিন ত্রিশাল ছিল বাংলাদেশের অসংখ্য সাধারণ গ্রামের মতো একটি অখ্যাত গ্রাম। সেদিন কে জানত এই গ্রামটি শুধু একজন দারোগার সময়োচিত একটি সহানুভূতিমূলক কাজের জন্য বিশ্বমানচিত্রে অন্যতম একটি স্থান হিসাবে খ্যাত হয়ে উঠবে!

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (২৫ মে, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও আর্থিক অনটনে থাকার কারণে বাবা-মা নজরুল ইসলামের নাম দিয়েছিলেন দুখুমিয়া। তাঁর পিতার নাম ফকির আহমদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। আট বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হলে জীবিকার খাতিরে নজরুলকে ‘লেটো’র দলে যোগ দিতে হয়। অল্প কিছুদিন পার ‘লেটো’ দল ত্যাগ করে পড়ালেখা শুরু করেন এবং দশ বছর বয়সে নিম্নমাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করেন। এরপর তিনি জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে মক্তবে শিক্ষকতার চাকরি নেন। অল্প কিছুদিন পর মক্তবের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আসানসোল চলে যান। আসানাসোল শহরে এসে একটি রুটির দোকানে কাজ নেন। রুটির দোকানে চাকরিকালীন দুখু মিয়াকে উদ্ধার করেন দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন, যিনি আজ একলাইন সাহিত্যকর্ম না-করেও বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।

দারোগা সাহেব আসানসোল থেকে দুখু মিয়াকে নিজ গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার দরিরামপুর গ্রামে নিয়ে আসেন। ত্রিশালে এনে তিনি নজরুলকে দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। এক বছর পর এখানকার পড়ালেখার পাঠ চুকে গেলে নজরুলকে চুরুলিয়ার রানীগঞ্জে শিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি করে দেন। এখানে নজরুল
তিন বছর পড়ালেখা করেছিলেন। এ সময় প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। কবি নজরুল তখন ওই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই তিনি দেশের স্বার্থে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। নজরুল ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে চাকুরি নিয়েছিলেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে বাঙালি পল্টন ভেঙে গেলে তাঁর সৈনিক জীবনের অবসান ঘটে। চাকরিরত অবস্থায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম গল্প ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ কলকাতার ‘সওগাত’ পত্রিকায় জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬ সংখ্যায় এবং প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ কলকাতার ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য’ পত্রিকায় শ্রাবণ ১৩২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এভাবেই জাতীয় কবির বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ‘বিজলী’ ও ‘মোসলেম’ পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসাবে খ্যাত হয়ে ওঠেন।

আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে এই কাজীর সিমলা গ্রামের অধিবাসী কাজী রফিজউল্লাহ সাহেব যখন চাকরিসূত্রে ভারতের বর্ধমানে ছিলেন তখন দুখুমিয়া নামের এই কিশোরটি রুটির দোকানে কাজ করে রাতে দারোগা সাহেবের বাসার বারান্দায় ঘুমাতে আসত। তাঁর চোখে-মুখে তখনই সুপ্ত প্রতিভার ছাপ দেখে দারোগা সাহেব নববধুর পরামর্শক্রমে দয়াপরবশ হয়ে সেই কিশোরকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। এটি ছিল ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের কথা। কিশোর নজরুলকে তখন দারোগা সাহেব কাজীর সিমলায় তাঁর নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৫ মাইল দূরে তখনকার নবপ্রতিষ্ঠিত নামকরা দরিরামপুর ইংলিশ হাইস্কুলে (বর্তমানে নজরুল একাডেমি) ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কাজীর সিমলা থেকে দরিরামপুর স্কুল দূরে হওয়ায় কাছাকাছি হিসাবে বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে জায়গীর ঠিক করে দেন দারোগা সাহেব। এখন বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি থেকে যে পাকা রাস্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার পাশ দিয়ে ত্রিশাল বাজারে গিয়েছে তখন এটি আইলের মতো একটি দু-পায়ে-হাঁটা রাস্তা মাত্র। কবি স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এবং পড়ার ফাঁকে এ বটতলায় বসে সমবয়সী বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে বাঁশি বাজাতেন। এখন এ শুকনি বিলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ত্রিশাল অবস্থানকালে নজরুল যে প্রায় বছরখানেক বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে ছিলেন সে ঘটনা দীর্ঘদিন অনেকের অজানা ছিল। ১৯৬৪-৬৫ খ্রিস্টাব্দের আগে বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ির কেউ জানতেনই না যে বিখ্যাত কবি ও লেখক কাজী নজরুল ইসলামই সে দুখুমিয়া। ওই সময়ে নজরুল জয়ন্তী উদ্যাপনের জন্য ময়মনসিংহ জেলার তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি এ নাজির ওই এলাকায় জিজ্ঞাসা করতে করতে এটি আবিষ্কার করেন। ত্রিশালেও দুখুমিয়া নামে একাধিক জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের সঙ্গে বর্ধমান, আসানসোল, চুরুলিয়া যেমনভাবে গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কাজীর সিমলা, দরিরামপুর, শুকনি বিলের নামাপাড়ায় অবস্থিত বটতলা, বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি প্রভৃতি। আর এজন্য একমাত্র কৃতিত্বের অধিকারী হচ্ছেন দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন।

দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন সাহেব দুখুমিয়াকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন বলেই তাঁকে আর জীবিকার তাগিদে লেটোর দলে থাকতে হয় নি, মক্তবে মুয়াজ্জিন হিসাবে আজান দিতে ও পড়াতে হয় নি, সর্বোপরি রুটির দোকানে কাজ করতে হয় নি। দারোগা সাহেব তখন যদি দুখু মিয়াকে রুটির দোকান থেকে এনে স্কুলে ভর্তি করিয়ে না-দিতেন তাহলে আমাদের জাতীয় কবি রুটির দোকানের কর্মচারী হয়ে থেকে যেতেন। দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন নজরুল স্কুলে ভর্তি করে তার শিক্ষার ভিতকে মজবুত করে দিয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায় নজরুল বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ সময় দুখুমিয়ার ভ্রমণ ব্যয়সহ যাবতীয় খরচ দিয়েছেন দারোগা কাজী রফিজউদ্দিন।

কবিগুরু যখন ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল বিজয়ী হয়ে বিশ্বকবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত তখন কিশোর নজরুলকে রুটির দোকানের কাজ ছাড়িয়ে দারোগা সাহেব কাজীর সিমলায় পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নিয়ে আসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। নজরুলকে সেদিন যদি কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগা ত্রিশালে নিয়ে না আসতেন তাহলে তিনি কবি নজরুল হয়ে উঠতে পারতেন না। পুলিশের একজন সদস্য হয়েও দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন সুদূর আসানসোল থেকে দয়াপরবশ হয়ে একজন হতভ্যাগা কিশোরকে এনে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ পুলিশের নাম শুনলেই আমাদের মনে কেমন ভীতি সঞ্চার হয়। আজ থেকে একশ বছর আগে পুলিশের আচরণ এর চেয়েও খারাপ ছিল। কিন্তু দারোগা রফিজ উদ্দিন এ অবস্থার মধ্যেও যা করেছেন তা শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো বিশ্বে বাংলাদেশের পুলিশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। সংগত কারণে কবি নজরুলের নামের পাশে স্বর্ণাক্ষরে কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগার নামও সমভাবে উচ্চকিত হবে।

নজরুল যখন কপর্দকহীন অবস্থায় পথে পথে ঘুরছিলেন, একবেলা অন্নের জন্য রুটির দোকানে কাজ করছিলেন, রাতে শোয়ার জায়গা না-থাকায় একজনের ঘরের বারান্দায় ঘুমাতেন, যখন তাকে দেখার মতো কেউ ছিল না তখন তার প্রতি একটি দরদি হাত এগিয়ে এসেছিল অনবদ্য ইতিহাস সৃষ্টির উল্লাসে- সে হাতটি ছিল একজন পুলিশ অফিসারের। জীবনে নিগৃহীত হতে হতে অবশেষে যিনি একজন দারোগার ভালোবাসায় বিদ্রোহী কবি হয়ে ওঠার সকল উপাদানে ঋদ্ধ হতে পেরেছেন তিলে তিলে।

কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগা পথের শিশু দুখুমিয়াকে দিয়েছেন পথের সন্ধান। যে পথ বেয়ে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে নজরুলের সৃষ্টি সম্ভারে। সত্যি পুলিশ জনগণের বন্ধু, বাংলা সাহিত্য এ পুলিশ অফিসারের অবদান কখনও ভুলবে না। এমন অবদান কী ভোলা যায়?

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

নজরুলের উৎস-পুরুষ

প্রকাশের সময় ০৬:১৭:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

যাঁর অবিশ্বাস্য অবদান দুখুমিয়া নামক একজন পথশিশুকে রুটির দোকানের কর্মচারী হতে উদ্ধার করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় কবি হওয়ার সমুদয় সুযোগ করে দিয়েছেন, তিনি কাজী রফিজ উদ্দিন, সাধারণ্যে যিনি দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন নামে সমধিক পরিচিত। দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন কোনও সাহিত্যকর্ম করেননি, কোনও কাব্য বা উপন্যাসও রচনা করেননি। তবু তিনি বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী ব্যক্তি হিসাবে অক্ষয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন। যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে, ততদিন থাকবে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম এবং ততদিন বেঁচে থাকবেন কাজী রফিজ উদ্দিন। রফিজ উদ্দিন দারোগার এ অবদান পুরো পুলিশ বিভাগের বিমল গর্ব। সেদিন ত্রিশাল ছিল বাংলাদেশের অসংখ্য সাধারণ গ্রামের মতো একটি অখ্যাত গ্রাম। সেদিন কে জানত এই গ্রামটি শুধু একজন দারোগার সময়োচিত একটি সহানুভূতিমূলক কাজের জন্য বিশ্বমানচিত্রে অন্যতম একটি স্থান হিসাবে খ্যাত হয়ে উঠবে!

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (২৫ মে, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও আর্থিক অনটনে থাকার কারণে বাবা-মা নজরুল ইসলামের নাম দিয়েছিলেন দুখুমিয়া। তাঁর পিতার নাম ফকির আহমদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। আট বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হলে জীবিকার খাতিরে নজরুলকে ‘লেটো’র দলে যোগ দিতে হয়। অল্প কিছুদিন পার ‘লেটো’ দল ত্যাগ করে পড়ালেখা শুরু করেন এবং দশ বছর বয়সে নিম্নমাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করেন। এরপর তিনি জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে মক্তবে শিক্ষকতার চাকরি নেন। অল্প কিছুদিন পর মক্তবের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আসানসোল চলে যান। আসানাসোল শহরে এসে একটি রুটির দোকানে কাজ নেন। রুটির দোকানে চাকরিকালীন দুখু মিয়াকে উদ্ধার করেন দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন, যিনি আজ একলাইন সাহিত্যকর্ম না-করেও বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।

দারোগা সাহেব আসানসোল থেকে দুখু মিয়াকে নিজ গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার দরিরামপুর গ্রামে নিয়ে আসেন। ত্রিশালে এনে তিনি নজরুলকে দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। এক বছর পর এখানকার পড়ালেখার পাঠ চুকে গেলে নজরুলকে চুরুলিয়ার রানীগঞ্জে শিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি করে দেন। এখানে নজরুল
তিন বছর পড়ালেখা করেছিলেন। এ সময় প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। কবি নজরুল তখন ওই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই তিনি দেশের স্বার্থে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। নজরুল ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে চাকুরি নিয়েছিলেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে বাঙালি পল্টন ভেঙে গেলে তাঁর সৈনিক জীবনের অবসান ঘটে। চাকরিরত অবস্থায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম গল্প ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ কলকাতার ‘সওগাত’ পত্রিকায় জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬ সংখ্যায় এবং প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ কলকাতার ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য’ পত্রিকায় শ্রাবণ ১৩২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এভাবেই জাতীয় কবির বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ‘বিজলী’ ও ‘মোসলেম’ পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসাবে খ্যাত হয়ে ওঠেন।

আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে এই কাজীর সিমলা গ্রামের অধিবাসী কাজী রফিজউল্লাহ সাহেব যখন চাকরিসূত্রে ভারতের বর্ধমানে ছিলেন তখন দুখুমিয়া নামের এই কিশোরটি রুটির দোকানে কাজ করে রাতে দারোগা সাহেবের বাসার বারান্দায় ঘুমাতে আসত। তাঁর চোখে-মুখে তখনই সুপ্ত প্রতিভার ছাপ দেখে দারোগা সাহেব নববধুর পরামর্শক্রমে দয়াপরবশ হয়ে সেই কিশোরকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। এটি ছিল ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের কথা। কিশোর নজরুলকে তখন দারোগা সাহেব কাজীর সিমলায় তাঁর নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৫ মাইল দূরে তখনকার নবপ্রতিষ্ঠিত নামকরা দরিরামপুর ইংলিশ হাইস্কুলে (বর্তমানে নজরুল একাডেমি) ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কাজীর সিমলা থেকে দরিরামপুর স্কুল দূরে হওয়ায় কাছাকাছি হিসাবে বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে জায়গীর ঠিক করে দেন দারোগা সাহেব। এখন বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি থেকে যে পাকা রাস্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার পাশ দিয়ে ত্রিশাল বাজারে গিয়েছে তখন এটি আইলের মতো একটি দু-পায়ে-হাঁটা রাস্তা মাত্র। কবি স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এবং পড়ার ফাঁকে এ বটতলায় বসে সমবয়সী বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে বাঁশি বাজাতেন। এখন এ শুকনি বিলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ত্রিশাল অবস্থানকালে নজরুল যে প্রায় বছরখানেক বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে ছিলেন সে ঘটনা দীর্ঘদিন অনেকের অজানা ছিল। ১৯৬৪-৬৫ খ্রিস্টাব্দের আগে বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ির কেউ জানতেনই না যে বিখ্যাত কবি ও লেখক কাজী নজরুল ইসলামই সে দুখুমিয়া। ওই সময়ে নজরুল জয়ন্তী উদ্যাপনের জন্য ময়মনসিংহ জেলার তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি এ নাজির ওই এলাকায় জিজ্ঞাসা করতে করতে এটি আবিষ্কার করেন। ত্রিশালেও দুখুমিয়া নামে একাধিক জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের সঙ্গে বর্ধমান, আসানসোল, চুরুলিয়া যেমনভাবে গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কাজীর সিমলা, দরিরামপুর, শুকনি বিলের নামাপাড়ায় অবস্থিত বটতলা, বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি প্রভৃতি। আর এজন্য একমাত্র কৃতিত্বের অধিকারী হচ্ছেন দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন।

দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন সাহেব দুখুমিয়াকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন বলেই তাঁকে আর জীবিকার তাগিদে লেটোর দলে থাকতে হয় নি, মক্তবে মুয়াজ্জিন হিসাবে আজান দিতে ও পড়াতে হয় নি, সর্বোপরি রুটির দোকানে কাজ করতে হয় নি। দারোগা সাহেব তখন যদি দুখু মিয়াকে রুটির দোকান থেকে এনে স্কুলে ভর্তি করিয়ে না-দিতেন তাহলে আমাদের জাতীয় কবি রুটির দোকানের কর্মচারী হয়ে থেকে যেতেন। দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন নজরুল স্কুলে ভর্তি করে তার শিক্ষার ভিতকে মজবুত করে দিয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায় নজরুল বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ সময় দুখুমিয়ার ভ্রমণ ব্যয়সহ যাবতীয় খরচ দিয়েছেন দারোগা কাজী রফিজউদ্দিন।

কবিগুরু যখন ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল বিজয়ী হয়ে বিশ্বকবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত তখন কিশোর নজরুলকে রুটির দোকানের কাজ ছাড়িয়ে দারোগা সাহেব কাজীর সিমলায় পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নিয়ে আসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। নজরুলকে সেদিন যদি কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগা ত্রিশালে নিয়ে না আসতেন তাহলে তিনি কবি নজরুল হয়ে উঠতে পারতেন না। পুলিশের একজন সদস্য হয়েও দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন সুদূর আসানসোল থেকে দয়াপরবশ হয়ে একজন হতভ্যাগা কিশোরকে এনে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ পুলিশের নাম শুনলেই আমাদের মনে কেমন ভীতি সঞ্চার হয়। আজ থেকে একশ বছর আগে পুলিশের আচরণ এর চেয়েও খারাপ ছিল। কিন্তু দারোগা রফিজ উদ্দিন এ অবস্থার মধ্যেও যা করেছেন তা শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো বিশ্বে বাংলাদেশের পুলিশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। সংগত কারণে কবি নজরুলের নামের পাশে স্বর্ণাক্ষরে কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগার নামও সমভাবে উচ্চকিত হবে।

নজরুল যখন কপর্দকহীন অবস্থায় পথে পথে ঘুরছিলেন, একবেলা অন্নের জন্য রুটির দোকানে কাজ করছিলেন, রাতে শোয়ার জায়গা না-থাকায় একজনের ঘরের বারান্দায় ঘুমাতেন, যখন তাকে দেখার মতো কেউ ছিল না তখন তার প্রতি একটি দরদি হাত এগিয়ে এসেছিল অনবদ্য ইতিহাস সৃষ্টির উল্লাসে- সে হাতটি ছিল একজন পুলিশ অফিসারের। জীবনে নিগৃহীত হতে হতে অবশেষে যিনি একজন দারোগার ভালোবাসায় বিদ্রোহী কবি হয়ে ওঠার সকল উপাদানে ঋদ্ধ হতে পেরেছেন তিলে তিলে।

কাজী রফিজ উদ্দিন দারোগা পথের শিশু দুখুমিয়াকে দিয়েছেন পথের সন্ধান। যে পথ বেয়ে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে নজরুলের সৃষ্টি সম্ভারে। সত্যি পুলিশ জনগণের বন্ধু, বাংলা সাহিত্য এ পুলিশ অফিসারের অবদান কখনও ভুলবে না। এমন অবদান কী ভোলা যায়?