Dhaka শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আদর্শ পরিবার থেকে আদর্শ সমাজ

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৩:৩৮:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৩ বার দেখা হয়েছে

একটি শিশুর জন্ম মানে শুধু একটি পরিবারের ঘরে নতুন অতিথির আগমন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। আজ যে শিশু মায়ের কোলে বেড়ে উঠছে, একদিন সে হতে পারে আলেম, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক কিংবা সমাজের কল্যাণে নিবেদিত একজন মানুষ। আবার সঠিক দিকনির্দেশনা, ভালোবাসা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে সেই শিশুই ভবিষ্যতে পরিবার ও সমাজের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ কারণেই ইসলাম সন্তান জন্মদানের পাশাপাশি তার সুন্দর ও সুশৃঙ্খল প্রতিপালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান, আদব-আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে একজন শিশুকে গড়ে তোলার যে শিক্ষা ইসলাম দিয়েছে, তা মূলত একটি সুন্দর পরিবার ও নৈতিক সমাজ নির্মাণের ভিত্তি।

আদর্শ সমাজের শুরু আদর্শ পরিবারে

বর্তমানে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি, অশ্লীলতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয় সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় সন্তান প্রতিপালনে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’
—সূরা আত-তাহরীম, আয়াত ৬

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, সন্তানের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করলেই পিতা-মাতার দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তানের ঈমান, চরিত্র, আমল ও আখিরাতের কল্যাণের দিকেও অভিভাবকদের মনোযোগ দিতে হবে।

সন্তান আল্লাহর দেওয়া আমানত

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান কোনো সম্পদ প্রদর্শনের বিষয় নয়। সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি মূল্যবান আমানত। এই আমানতের যথাযথ যত্ন ও অধিকার আদায় করতে পারলে তা পিতা-মাতার জন্য দুনিয়ার প্রশান্তির পাশাপাশি আখিরাতের নাজাতের কারণ হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা। আর স্থায়ী সৎকর্মই তোমার রবের কাছে উত্তম প্রতিদান ও উত্তম আশা।’
—সূরা আল-কাহফ, আয়াত ৪৬

তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে শুধু ভালো চাকরি, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা কিংবা সামাজিক মর্যাদা বোঝালে চলবে না। একজন সন্তান সত্যবাদী, সৎ, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছে কি না—সেটিই হওয়া উচিত অভিভাবকের বড় সাফল্য।

নেক সন্তানের জন্য দোয়া

সন্তান প্রতিপালনের প্রস্তুতি তার জন্মের পর থেকে নয়, বরং তারও আগে শুরু হয়। জীবনসঙ্গী নির্বাচনে সতর্কতা, হালাল উপার্জন এবং আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের জন্য দোয়া—ইসলামী পরিবার গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি দোয়া এভাবে এসেছে—

‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।’
—সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪

নিজেদের জীবনকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করার পাশাপাশি সন্তানের জন্য দোয়া করা একটি পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সন্তান মানুষ করা ইবাদতেরও অংশ

শিশুর মনে ছোটবেলা থেকেই তাওহিদ, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, সালাত, কোরআনের শিক্ষা, শিষ্টাচার ও মানবিক মূল্যবোধের বীজ বপন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনে হজরত লোকমান (আ.)-এর উপদেশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি তাঁর সন্তানকে বলেছিলেন—

‘হে আমার প্রিয় সন্তান! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।’
—সূরা লুকমান, আয়াত ১৩

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই সালাতের প্রতি অভ্যস্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে সালাতের নির্দেশ দাও।’ —সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৫।

অর্থাৎ সন্তানকে দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি পিতা-মাতার জন্য সওয়াবের কাজও হতে পারে।

পিতা-মাতাই সন্তানের প্রথম আদর্শ

শিশুকে যত কথাই বলা হোক, সে সবচেয়ে বেশি শেখে তার চারপাশের মানুষের আচরণ দেখে। তাই সন্তানকে সত্যবাদী হতে বলার পাশাপাশি পিতা-মাতাকে নিজের জীবনেও সত্যবাদিতার চর্চা করতে হবে। ঘরে সালাত, কোরআন তিলাওয়াত, বিনয়, শালীনতা, পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার পরিবেশ থাকলে শিশুর ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ —জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫।

সন্তানের কাছে তাই পিতা-মাতার ব্যক্তিগত আচরণই অনেক সময় সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা হয়ে ওঠে।

প্রযুক্তির যুগে অভিভাবকের বাড়তি দায়িত্ব

বর্তমান সময়ে শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু সে ফোনে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কতটা সময় ব্যয় করছে—সেদিকে নজর রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম কিংবা অনুপযুক্ত কনটেন্ট শিশুর স্বাভাবিক মানসিক ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে একেবারে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে সন্তানকে এর দায়িত্বশীল ও নিরাপদ ব্যবহার শেখানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বয়স অনুযায়ী সীমা নির্ধারণ এবং অভিভাবকের সচেতন নজরদারিও জরুরি।

সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য নয়

একই পরিবারের সন্তানদের মধ্যে ভালোবাসা ও আচরণে বৈষম্য তৈরি হলে তাদের মনে ক্ষোভ, ঈর্ষা ও দূরত্ব জন্ম নিতে পারে। তাই ইসলাম সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। —সহিহ বুখারি, হাদিস ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬২৩।

ভালোবাসা প্রকাশ, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া কিংবা শাসনের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের ন্যায্যতা বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত।

হালাল রিজিকের গুরুত্ব

সন্তানের জন্য উন্নত খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সেই সম্পদের উৎসও পবিত্র কি না, তা একজন মুসলিম অভিভাবককে বিবেচনা করতে হবে। হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া ইসলামী জীবনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সন্তানের শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি তার নৈতিক ও আত্মিক বিকাশের জন্যও একটি পবিত্র পারিবারিক পরিবেশ প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার

সন্তানের জন্য বিপুল সম্পদ রেখে যাওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য নয়। সম্পদ একসময় শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু ভালো শিক্ষা, বিশুদ্ধ ঈমান ও উত্তম চরিত্র সন্তানের জীবনকে দীর্ঘদিন আলোকিত করতে পারে।

তাই পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হতে পারে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি নৈতিক; সফল হওয়ার পাশাপাশি সৎ; নিজের জন্য বাঁচার পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।

আদর্শ সন্তান গড়ে উঠলে পরিবারে শান্তি আসে, পরিবারগুলো ভালো হলে সমাজে নৈতিকতার ভিত্তি শক্ত হয়। আর নৈতিক সমাজই একটি কল্যাণমুখী জাতির ভিত্তি তৈরি করে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি অর্থে সফল নয়, বরং ঈমানদার, চরিত্রবান, জ্ঞানী, মানবিক এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণকারী আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সম্পর্কিত

পৃথিবী, মহাসাগর ও ইতিহাসের অজানা অধ্যায় নিয়ে সেরা বাংলা ডকুমেন্টারি

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

স্বাদে, মানে ও ভালোবাসায়—লেক ভিউ কেক

আদর্শ পরিবার থেকে আদর্শ সমাজ

প্রকাশের সময় ০৩:৩৮:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

একটি শিশুর জন্ম মানে শুধু একটি পরিবারের ঘরে নতুন অতিথির আগমন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। আজ যে শিশু মায়ের কোলে বেড়ে উঠছে, একদিন সে হতে পারে আলেম, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক কিংবা সমাজের কল্যাণে নিবেদিত একজন মানুষ। আবার সঠিক দিকনির্দেশনা, ভালোবাসা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে সেই শিশুই ভবিষ্যতে পরিবার ও সমাজের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ কারণেই ইসলাম সন্তান জন্মদানের পাশাপাশি তার সুন্দর ও সুশৃঙ্খল প্রতিপালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান, আদব-আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে একজন শিশুকে গড়ে তোলার যে শিক্ষা ইসলাম দিয়েছে, তা মূলত একটি সুন্দর পরিবার ও নৈতিক সমাজ নির্মাণের ভিত্তি।

আদর্শ সমাজের শুরু আদর্শ পরিবারে

বর্তমানে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি, অশ্লীলতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয় সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় সন্তান প্রতিপালনে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’
—সূরা আত-তাহরীম, আয়াত ৬

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, সন্তানের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করলেই পিতা-মাতার দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তানের ঈমান, চরিত্র, আমল ও আখিরাতের কল্যাণের দিকেও অভিভাবকদের মনোযোগ দিতে হবে।

সন্তান আল্লাহর দেওয়া আমানত

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান কোনো সম্পদ প্রদর্শনের বিষয় নয়। সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি মূল্যবান আমানত। এই আমানতের যথাযথ যত্ন ও অধিকার আদায় করতে পারলে তা পিতা-মাতার জন্য দুনিয়ার প্রশান্তির পাশাপাশি আখিরাতের নাজাতের কারণ হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা। আর স্থায়ী সৎকর্মই তোমার রবের কাছে উত্তম প্রতিদান ও উত্তম আশা।’
—সূরা আল-কাহফ, আয়াত ৪৬

তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে শুধু ভালো চাকরি, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা কিংবা সামাজিক মর্যাদা বোঝালে চলবে না। একজন সন্তান সত্যবাদী, সৎ, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছে কি না—সেটিই হওয়া উচিত অভিভাবকের বড় সাফল্য।

নেক সন্তানের জন্য দোয়া

সন্তান প্রতিপালনের প্রস্তুতি তার জন্মের পর থেকে নয়, বরং তারও আগে শুরু হয়। জীবনসঙ্গী নির্বাচনে সতর্কতা, হালাল উপার্জন এবং আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের জন্য দোয়া—ইসলামী পরিবার গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি দোয়া এভাবে এসেছে—

‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।’
—সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪

নিজেদের জীবনকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করার পাশাপাশি সন্তানের জন্য দোয়া করা একটি পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সন্তান মানুষ করা ইবাদতেরও অংশ

শিশুর মনে ছোটবেলা থেকেই তাওহিদ, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, সালাত, কোরআনের শিক্ষা, শিষ্টাচার ও মানবিক মূল্যবোধের বীজ বপন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনে হজরত লোকমান (আ.)-এর উপদেশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি তাঁর সন্তানকে বলেছিলেন—

‘হে আমার প্রিয় সন্তান! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।’
—সূরা লুকমান, আয়াত ১৩

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই সালাতের প্রতি অভ্যস্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে সালাতের নির্দেশ দাও।’ —সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৫।

অর্থাৎ সন্তানকে দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি পিতা-মাতার জন্য সওয়াবের কাজও হতে পারে।

পিতা-মাতাই সন্তানের প্রথম আদর্শ

শিশুকে যত কথাই বলা হোক, সে সবচেয়ে বেশি শেখে তার চারপাশের মানুষের আচরণ দেখে। তাই সন্তানকে সত্যবাদী হতে বলার পাশাপাশি পিতা-মাতাকে নিজের জীবনেও সত্যবাদিতার চর্চা করতে হবে। ঘরে সালাত, কোরআন তিলাওয়াত, বিনয়, শালীনতা, পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার পরিবেশ থাকলে শিশুর ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ —জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫।

সন্তানের কাছে তাই পিতা-মাতার ব্যক্তিগত আচরণই অনেক সময় সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা হয়ে ওঠে।

প্রযুক্তির যুগে অভিভাবকের বাড়তি দায়িত্ব

বর্তমান সময়ে শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু সে ফোনে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কতটা সময় ব্যয় করছে—সেদিকে নজর রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম কিংবা অনুপযুক্ত কনটেন্ট শিশুর স্বাভাবিক মানসিক ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে একেবারে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে সন্তানকে এর দায়িত্বশীল ও নিরাপদ ব্যবহার শেখানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বয়স অনুযায়ী সীমা নির্ধারণ এবং অভিভাবকের সচেতন নজরদারিও জরুরি।

সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য নয়

একই পরিবারের সন্তানদের মধ্যে ভালোবাসা ও আচরণে বৈষম্য তৈরি হলে তাদের মনে ক্ষোভ, ঈর্ষা ও দূরত্ব জন্ম নিতে পারে। তাই ইসলাম সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। —সহিহ বুখারি, হাদিস ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬২৩।

ভালোবাসা প্রকাশ, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া কিংবা শাসনের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের ন্যায্যতা বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত।

হালাল রিজিকের গুরুত্ব

সন্তানের জন্য উন্নত খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সেই সম্পদের উৎসও পবিত্র কি না, তা একজন মুসলিম অভিভাবককে বিবেচনা করতে হবে। হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া ইসলামী জীবনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সন্তানের শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি তার নৈতিক ও আত্মিক বিকাশের জন্যও একটি পবিত্র পারিবারিক পরিবেশ প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার

সন্তানের জন্য বিপুল সম্পদ রেখে যাওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য নয়। সম্পদ একসময় শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু ভালো শিক্ষা, বিশুদ্ধ ঈমান ও উত্তম চরিত্র সন্তানের জীবনকে দীর্ঘদিন আলোকিত করতে পারে।

তাই পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হতে পারে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি নৈতিক; সফল হওয়ার পাশাপাশি সৎ; নিজের জন্য বাঁচার পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।

আদর্শ সন্তান গড়ে উঠলে পরিবারে শান্তি আসে, পরিবারগুলো ভালো হলে সমাজে নৈতিকতার ভিত্তি শক্ত হয়। আর নৈতিক সমাজই একটি কল্যাণমুখী জাতির ভিত্তি তৈরি করে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি অর্থে সফল নয়, বরং ঈমানদার, চরিত্রবান, জ্ঞানী, মানবিক এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণকারী আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।