বাংলাদেশ 8:36 pm, Wednesday, 28 October 2026

লগি-বৈঠা তাণ্ডবের দুই দশক: হাসিনাসহ খুনিদের ফাঁসি চায় জামায়াত

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ও কলঙ্কজনক অধ্যায়। লগি-বৈঠা দিয়ে বর্বরোচিত হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের দুই দশক পূর্ণ হলো আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর)। ২০০৬ সালের এই দিনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রকাশ্যে দিবালোকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। দীর্ঘ দুই দশক পর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে লগি-বৈঠা তাণ্ডবকে ‘পূর্বপরিকল্পিত মানবতাবিরোধী গণহত্যা’ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ জড়িত সকল খুনিদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও শহীদ পরিবারগুলো।

২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে তৎকালীন ১৪ দলীয় জোটের প্রধান শেখ হাসিনা রাজধানীজুড়ে লগি-বৈঠা আন্দোলনের ডাক দেন। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিদায়ী ভাষণের পর থেকেই দেশজুড়ে তাণ্ডব শুরু হয়।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে জামায়াতে ইসলামীর পূর্বনির্ধারিত সমাবেশস্থলে হামলা চালায় অস্ত্রধারী আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। তোপখানা রোড, বিজয়নগর ও মুক্তাঙ্গন দিক থেকে একযোগে লগি, বৈঠা, আগ্নেয়াস্ত্র ও ককটেল নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে তারা।

প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় শিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম ও জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিনসহ ছয়জনকে। জসিম উদ্দিনের মৃতদেহের ওপর উঠে সন্ত্রাসীদের পৈশাচিক নাচের দৃশ্য বিশ্ব বিবেককে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে জোটের অন্তত ৫৪ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান এবং আহত হন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।

২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর জামায়াতের পক্ষ থেকে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের ১০ এপ্রিল পুলিশ শেখ হাসিনাকে প্রধান হুকুমের আসামি করে এবং তোফায়েল আহমেদ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে মামলাটি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে পৈশাচিক এই হত্যাযজ্ঞের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয় এবং উল্টো শহীদদের স্বজনদের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ নিপীড়ন।

পল্টন ট্র্যাজেডির দুই দশক পূর্তিতে নিহতদের স্মরণ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, “২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি-বৈঠার তাণ্ডব ছিল পূর্বপরিকল্পিত মানবতাবিরোধী গণহত্যা। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের দাবি—অবিলম্বে ২৮ অক্টোবরের খুনিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বাতিলকৃত মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে।” একই দাবি জানিয়েছেন শহীদদের স্বজনেরাও। নিহত হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের বাবা তাজুল ইসলাম বলেন, “মানুষকে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যার সেই দৃশ্য আজও আমাদের তারা করে। হাসিনাই এই হত্যার মূল নির্দেশদাতা। তাকে ফাঁসি দেওয়া না হলে আমরা ন্যায়বিচার পাব না।” আইনজীবীদের সূত্রমতে, আওয়ামী সরকারের আমলে গায়েব করা মামলার নথি ও অনুলিপি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুতই ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ আদালতে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সচল করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করার দাবিতে শ্যামনগরে মানববন্ধন

লগি-বৈঠা তাণ্ডবের দুই দশক: হাসিনাসহ খুনিদের ফাঁসি চায় জামায়াত

প্রকাশ 12:05:35 pm, Wednesday, 28 October 2026

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ও কলঙ্কজনক অধ্যায়। লগি-বৈঠা দিয়ে বর্বরোচিত হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের দুই দশক পূর্ণ হলো আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর)। ২০০৬ সালের এই দিনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রকাশ্যে দিবালোকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। দীর্ঘ দুই দশক পর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে লগি-বৈঠা তাণ্ডবকে ‘পূর্বপরিকল্পিত মানবতাবিরোধী গণহত্যা’ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ জড়িত সকল খুনিদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও শহীদ পরিবারগুলো।

২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে তৎকালীন ১৪ দলীয় জোটের প্রধান শেখ হাসিনা রাজধানীজুড়ে লগি-বৈঠা আন্দোলনের ডাক দেন। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিদায়ী ভাষণের পর থেকেই দেশজুড়ে তাণ্ডব শুরু হয়।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে জামায়াতে ইসলামীর পূর্বনির্ধারিত সমাবেশস্থলে হামলা চালায় অস্ত্রধারী আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। তোপখানা রোড, বিজয়নগর ও মুক্তাঙ্গন দিক থেকে একযোগে লগি, বৈঠা, আগ্নেয়াস্ত্র ও ককটেল নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে তারা।

প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় শিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম ও জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিনসহ ছয়জনকে। জসিম উদ্দিনের মৃতদেহের ওপর উঠে সন্ত্রাসীদের পৈশাচিক নাচের দৃশ্য বিশ্ব বিবেককে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে জোটের অন্তত ৫৪ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান এবং আহত হন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।

২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর জামায়াতের পক্ষ থেকে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের ১০ এপ্রিল পুলিশ শেখ হাসিনাকে প্রধান হুকুমের আসামি করে এবং তোফায়েল আহমেদ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে মামলাটি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে পৈশাচিক এই হত্যাযজ্ঞের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয় এবং উল্টো শহীদদের স্বজনদের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ নিপীড়ন।

পল্টন ট্র্যাজেডির দুই দশক পূর্তিতে নিহতদের স্মরণ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, “২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি-বৈঠার তাণ্ডব ছিল পূর্বপরিকল্পিত মানবতাবিরোধী গণহত্যা। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের দাবি—অবিলম্বে ২৮ অক্টোবরের খুনিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বাতিলকৃত মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে।” একই দাবি জানিয়েছেন শহীদদের স্বজনেরাও। নিহত হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের বাবা তাজুল ইসলাম বলেন, “মানুষকে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যার সেই দৃশ্য আজও আমাদের তারা করে। হাসিনাই এই হত্যার মূল নির্দেশদাতা। তাকে ফাঁসি দেওয়া না হলে আমরা ন্যায়বিচার পাব না।” আইনজীবীদের সূত্রমতে, আওয়ামী সরকারের আমলে গায়েব করা মামলার নথি ও অনুলিপি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুতই ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ আদালতে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সচল করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।