বাংলাদেশ 11:28 am, Thursday, 29 October 2026
বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য কী শিক্ষা?

ব্রাজিলের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারের জয়

রাজনীতিতে জনসমর্থন অর্জনের লড়াই এখন আর কেবল জনসভা, মিছিল কিংবা প্রচলিত গণমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনও রাজনৈতিক যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হোয়াটসঅ্যাপ কীভাবে প্রচার, সমর্থক সংগঠিত করা ও রাজনৈতিক বার্তা ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয় দফায় জয়ী হন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তাঁর প্রচারে রাজপথের তৎপরতা, রাজনৈতিক সংগঠন ও ডিজিটাল যোগাযোগের সমন্বয় আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁর জয়ের পেছনে কোনো একটি মাধ্যমের একক ভূমিকা ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

প্রথম দফায় পিছিয়ে, দ্বিতীয় দফায় জয়:

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা অনুষ্ঠিত হয় ৪ অক্টোবর ২০২৬। এতে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭.০৩ শতাংশ এবং লুলা ৪৫.১৬ শতাংশ বৈধ ভোট পান। কেউ প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়ায়। ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফায় লুলা ৫১.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে প্রায় ৪.৪ মিলিয়ন ভোট বেশি পান। ফলাফল ঘোষণা করে ব্রাজিলের সুপ্রিম নির্বাচনী আদালত (টিএসই)। চূড়ান্ত ভোটের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা টিএসই-র সর্বশেষ ঘোষণা থেকে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

ফ্লাভিও বলসোনারো ফল মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং ফল বাতিলের আহ্বান জানান। ভোটকেন্দ্রে কিছু বিশৃঙ্খলা ও ভোটদানের সময় বাড়ানো নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। আইনি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, ফল বাতিলের যথেষ্ট ভিত্তি নেই। লুলা নির্বাচনের সময় ৮০ বছর বয়সী ছিলেন এবং ২৭ অক্টোবর ৮১ বছরে পা দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আধুনিক নির্বাচনে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ভোটারের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর কৌশলও প্রয়োজন।

হোয়াটসঅ্যাপ: যোগাযোগ থেকে সমর্থক সংগঠিত করার মাধ্যম:

নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ‘Exército do Lula’ বা ‘লুলার সেনাবাহিনী’ নামের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল। চ্যানেলটি পরিচালনা করেন ব্রাজিলের ফেডারেল ডেপুটি আন্দ্রে জানোনেস। প্রথম দফার পর তিনি লুলার পক্ষে সমর্থকদের আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেন। অনুসারীদের প্রচারমূলক কাজে অংশ নিতে, পরিচিতদের কাছে বার্তা পৌঁছাতে এবং নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ ছড়াতে উৎসাহিত করা হয়। ব্রাজিলের সিনেট টিভির একটি প্রতিবেদনের (২৬ অক্টোবর) বরাত অনুযায়ী, ১২ থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে লুলার চ্যানেলের অনুসারী প্রায় ৩৮ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখে পৌঁছায়। একই সময়ে বলসোনারোর চ্যানেলের অনুসারী প্রায় ১৪ লাখ থেকে বেড়ে ২১ লাখ হয়। এই সংখ্যা নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ডিজিটাল প্রচারের দ্রুত বিস্তার দেখায়। চ্যানেলটির বিশেষত্ব ছিল শুধু অনুসারী সংগ্রহ নয়, বরং তাঁদের নির্দিষ্ট প্রচারমূলক কাজে যুক্ত করা। ভিডিও শেয়ার করা, পরিচিতদের যুক্ত হতে বলা এবং প্রচারবার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কাজ দেওয়া হতো। এভাবে চ্যানেলটি সমর্থকদের সমন্বয়ের একটি পরিসরে পরিণত হয়।

তবে অনুসারী হওয়া, বার্তা দেখা এবং ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া এক বিষয় নয়। ১ কোটি ৮ লাখ অনুসারী মানেই সমসংখ্যক ভোটার নয়, এবং তাঁরা সবাই লুলাকে ভোট দিয়েছেন, এমন দাবিও করা যায় না। আল-জাজিরার একটি বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে যে চ্যানেলের কার্যক্রম ও নির্বাচনী ফলাফলের সরাসরি সম্পর্ক পরিমাপ করা কঠিন। তাই হোয়াটসঅ্যাপকে লুলার জয়ের একমাত্র কারণ হিসেবে না দেখে তাঁর প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিসংগত।

চ্যানেলটি নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। ১১ অক্টোবর টিএসই-র প্রেসিডেন্ট চ্যানেলটি স্থগিত করার নির্দেশ দেন, যা বলসোনারোর প্রচারের আবেদনের ভিত্তিতে ছিল। পরে ২৩ অক্টোবর অন্য একজন বিচারক এই স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা আটকে দেন। এর আগে লুলার প্রচার চ্যানেলটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করলে এটি আবার চালু হয়। অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট কিছু বার্তার পুনঃপ্রচার খোঁজা হয়েছিল এবং সরকারি সংবাদ সংস্থা এজেন্সিয়া ব্রাজিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের পর্যালোচনায় তা পাওয়া যায়নি। তবে এটি সব বার্তার চূড়ান্ত নির্দোষতার প্রমাণ নয়; এটি ছিল নির্দিষ্ট সময় ও অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি পর্যালোচনা।

ডিজিটাল প্রচার ও মাঠের রাজনীতি:

হোয়াটসঅ্যাপের বড় সুবিধা হলো দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছানো এবং সমর্থকদের নির্দিষ্ট কার্যক্রমে অংশ নিতে উৎসাহিত করা। প্রচলিত গণমাধ্যমের বক্তব্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করে আরও মানুষের কাছে নেওয়া যায়, আর সমর্থকেরাও প্রচারের অংশ হতে পারেন। তবে লুলার প্রচার শুধু অনলাইনে নির্ভরশীল ছিল না। নির্বাচনী সমাবেশ, সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মাঠের কর্মীদের তৎপরতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রযুক্তি রাজনৈতিক সংগঠনের বিকল্প নয়; বরং সংগঠনকে বিস্তৃত করার মাধ্যম হতে পারে। মাঠের সংগঠন দুর্বল হলে অনলাইন জনপ্রিয়তা ভোটে রূপ নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে তুলনা:

বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাস, নির্বাচনব্যবস্থা ও দলীয় কাঠামো এক নয়। ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) ও লিবারেল পার্টির (পিএল) প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সমতুল্য ধরা যায় না। তবু একটি সাধারণ প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক: রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে ভোটারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে এবং নির্বাচনের সময় তা কীভাবে সক্রিয় করে? নেতার বক্তব্য বা জনসভার ভিডিও প্রকাশই ডিজিটাল রাজনীতির পূর্ণাঙ্গ রূপ নয়। স্থানীয় সমস্যা শোনা, অভিযোগের জবাব দেওয়া, প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি জানানো এবং তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এর অংশ হতে পারে। নির্বাচনের আগে হঠাৎ অনলাইন তৎপরতা বাড়ানোর চেয়ে সারা বছর জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাই বেশি কার্যকর।

ঝুঁকি ও জবাবদিহি:

ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার যেমন অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ায়। মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও সম্পাদিত বক্তব্য দ্রুত ছড়াতে পারে। কোনো বার্তা বিপুল মানুষের কাছে পৌঁছালেই তা সত্য হয়ে যায় না। নির্বাচনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বাচনী আইনের প্রয়োগ, তথ্যের সত্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের ন্যায্য সুযোগের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব যাচাই ছাড়া তথ্য না ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল থাকা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষকে হেয় করা বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তথ্যের সত্যতা যাচাই, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং নাগরিকের মতামতের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ব্রাজিলের নির্বাচন থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ কোনো একটি দল বা প্রার্থীর বিজয় অনুকরণ করা নয়, বরং আধুনিক নির্বাচনে রাজনৈতিক যোগাযোগ কীভাবে বদলাচ্ছে তা বোঝা। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলের দ্রুত বিস্তার দেখিয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সমর্থকদের সংগঠিত করার কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। একই সঙ্গে ফলাফল মনে করায়, অনুসারীর সংখ্যা ও ভোটের মধ্যে সরাসরি সমীকরণ টানা যায় না। প্রযুক্তি বার্তা ছড়াতে ও সমর্থকদের সংগঠিত করতে পারে। কিন্তু আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি, দায়িত্বশীল আচরণ, বাস্তব কাজ ও জবাবদিহি। ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এই প্রশ্নটি রাখে: প্রযুক্তিকে শুধু ভোট জেতার কৌশল হিসেবে দেখা হবে, নাকি জনগণের সঙ্গে স্থায়ী আস্থা ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হবে?

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

হাতে-কলমে সাংবাদিকতা: নতুন সাংবাদিকদের জন্য বিনামূল্যের ইবুক

বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য কী শিক্ষা?

ব্রাজিলের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারের জয়

প্রকাশ 09:44:13 am, Thursday, 29 October 2026

রাজনীতিতে জনসমর্থন অর্জনের লড়াই এখন আর কেবল জনসভা, মিছিল কিংবা প্রচলিত গণমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনও রাজনৈতিক যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হোয়াটসঅ্যাপ কীভাবে প্রচার, সমর্থক সংগঠিত করা ও রাজনৈতিক বার্তা ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয় দফায় জয়ী হন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তাঁর প্রচারে রাজপথের তৎপরতা, রাজনৈতিক সংগঠন ও ডিজিটাল যোগাযোগের সমন্বয় আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁর জয়ের পেছনে কোনো একটি মাধ্যমের একক ভূমিকা ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

প্রথম দফায় পিছিয়ে, দ্বিতীয় দফায় জয়:

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা অনুষ্ঠিত হয় ৪ অক্টোবর ২০২৬। এতে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭.০৩ শতাংশ এবং লুলা ৪৫.১৬ শতাংশ বৈধ ভোট পান। কেউ প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়ায়। ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফায় লুলা ৫১.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে প্রায় ৪.৪ মিলিয়ন ভোট বেশি পান। ফলাফল ঘোষণা করে ব্রাজিলের সুপ্রিম নির্বাচনী আদালত (টিএসই)। চূড়ান্ত ভোটের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা টিএসই-র সর্বশেষ ঘোষণা থেকে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

ফ্লাভিও বলসোনারো ফল মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং ফল বাতিলের আহ্বান জানান। ভোটকেন্দ্রে কিছু বিশৃঙ্খলা ও ভোটদানের সময় বাড়ানো নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। আইনি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, ফল বাতিলের যথেষ্ট ভিত্তি নেই। লুলা নির্বাচনের সময় ৮০ বছর বয়সী ছিলেন এবং ২৭ অক্টোবর ৮১ বছরে পা দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আধুনিক নির্বাচনে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ভোটারের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর কৌশলও প্রয়োজন।

হোয়াটসঅ্যাপ: যোগাযোগ থেকে সমর্থক সংগঠিত করার মাধ্যম:

নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ‘Exército do Lula’ বা ‘লুলার সেনাবাহিনী’ নামের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল। চ্যানেলটি পরিচালনা করেন ব্রাজিলের ফেডারেল ডেপুটি আন্দ্রে জানোনেস। প্রথম দফার পর তিনি লুলার পক্ষে সমর্থকদের আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেন। অনুসারীদের প্রচারমূলক কাজে অংশ নিতে, পরিচিতদের কাছে বার্তা পৌঁছাতে এবং নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ ছড়াতে উৎসাহিত করা হয়। ব্রাজিলের সিনেট টিভির একটি প্রতিবেদনের (২৬ অক্টোবর) বরাত অনুযায়ী, ১২ থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে লুলার চ্যানেলের অনুসারী প্রায় ৩৮ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখে পৌঁছায়। একই সময়ে বলসোনারোর চ্যানেলের অনুসারী প্রায় ১৪ লাখ থেকে বেড়ে ২১ লাখ হয়। এই সংখ্যা নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ডিজিটাল প্রচারের দ্রুত বিস্তার দেখায়। চ্যানেলটির বিশেষত্ব ছিল শুধু অনুসারী সংগ্রহ নয়, বরং তাঁদের নির্দিষ্ট প্রচারমূলক কাজে যুক্ত করা। ভিডিও শেয়ার করা, পরিচিতদের যুক্ত হতে বলা এবং প্রচারবার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কাজ দেওয়া হতো। এভাবে চ্যানেলটি সমর্থকদের সমন্বয়ের একটি পরিসরে পরিণত হয়।

তবে অনুসারী হওয়া, বার্তা দেখা এবং ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া এক বিষয় নয়। ১ কোটি ৮ লাখ অনুসারী মানেই সমসংখ্যক ভোটার নয়, এবং তাঁরা সবাই লুলাকে ভোট দিয়েছেন, এমন দাবিও করা যায় না। আল-জাজিরার একটি বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে যে চ্যানেলের কার্যক্রম ও নির্বাচনী ফলাফলের সরাসরি সম্পর্ক পরিমাপ করা কঠিন। তাই হোয়াটসঅ্যাপকে লুলার জয়ের একমাত্র কারণ হিসেবে না দেখে তাঁর প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিসংগত।

চ্যানেলটি নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। ১১ অক্টোবর টিএসই-র প্রেসিডেন্ট চ্যানেলটি স্থগিত করার নির্দেশ দেন, যা বলসোনারোর প্রচারের আবেদনের ভিত্তিতে ছিল। পরে ২৩ অক্টোবর অন্য একজন বিচারক এই স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা আটকে দেন। এর আগে লুলার প্রচার চ্যানেলটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করলে এটি আবার চালু হয়। অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট কিছু বার্তার পুনঃপ্রচার খোঁজা হয়েছিল এবং সরকারি সংবাদ সংস্থা এজেন্সিয়া ব্রাজিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের পর্যালোচনায় তা পাওয়া যায়নি। তবে এটি সব বার্তার চূড়ান্ত নির্দোষতার প্রমাণ নয়; এটি ছিল নির্দিষ্ট সময় ও অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি পর্যালোচনা।

ডিজিটাল প্রচার ও মাঠের রাজনীতি:

হোয়াটসঅ্যাপের বড় সুবিধা হলো দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছানো এবং সমর্থকদের নির্দিষ্ট কার্যক্রমে অংশ নিতে উৎসাহিত করা। প্রচলিত গণমাধ্যমের বক্তব্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করে আরও মানুষের কাছে নেওয়া যায়, আর সমর্থকেরাও প্রচারের অংশ হতে পারেন। তবে লুলার প্রচার শুধু অনলাইনে নির্ভরশীল ছিল না। নির্বাচনী সমাবেশ, সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মাঠের কর্মীদের তৎপরতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রযুক্তি রাজনৈতিক সংগঠনের বিকল্প নয়; বরং সংগঠনকে বিস্তৃত করার মাধ্যম হতে পারে। মাঠের সংগঠন দুর্বল হলে অনলাইন জনপ্রিয়তা ভোটে রূপ নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে তুলনা:

বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাস, নির্বাচনব্যবস্থা ও দলীয় কাঠামো এক নয়। ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) ও লিবারেল পার্টির (পিএল) প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সমতুল্য ধরা যায় না। তবু একটি সাধারণ প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক: রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে ভোটারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে এবং নির্বাচনের সময় তা কীভাবে সক্রিয় করে? নেতার বক্তব্য বা জনসভার ভিডিও প্রকাশই ডিজিটাল রাজনীতির পূর্ণাঙ্গ রূপ নয়। স্থানীয় সমস্যা শোনা, অভিযোগের জবাব দেওয়া, প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি জানানো এবং তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এর অংশ হতে পারে। নির্বাচনের আগে হঠাৎ অনলাইন তৎপরতা বাড়ানোর চেয়ে সারা বছর জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাই বেশি কার্যকর।

ঝুঁকি ও জবাবদিহি:

ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার যেমন অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ায়। মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও সম্পাদিত বক্তব্য দ্রুত ছড়াতে পারে। কোনো বার্তা বিপুল মানুষের কাছে পৌঁছালেই তা সত্য হয়ে যায় না। নির্বাচনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বাচনী আইনের প্রয়োগ, তথ্যের সত্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের ন্যায্য সুযোগের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব যাচাই ছাড়া তথ্য না ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল থাকা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষকে হেয় করা বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তথ্যের সত্যতা যাচাই, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং নাগরিকের মতামতের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ব্রাজিলের নির্বাচন থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ কোনো একটি দল বা প্রার্থীর বিজয় অনুকরণ করা নয়, বরং আধুনিক নির্বাচনে রাজনৈতিক যোগাযোগ কীভাবে বদলাচ্ছে তা বোঝা। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলের দ্রুত বিস্তার দেখিয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সমর্থকদের সংগঠিত করার কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। একই সঙ্গে ফলাফল মনে করায়, অনুসারীর সংখ্যা ও ভোটের মধ্যে সরাসরি সমীকরণ টানা যায় না। প্রযুক্তি বার্তা ছড়াতে ও সমর্থকদের সংগঠিত করতে পারে। কিন্তু আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি, দায়িত্বশীল আচরণ, বাস্তব কাজ ও জবাবদিহি। ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এই প্রশ্নটি রাখে: প্রযুক্তিকে শুধু ভোট জেতার কৌশল হিসেবে দেখা হবে, নাকি জনগণের সঙ্গে স্থায়ী আস্থা ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হবে?