বাংলাদেশ 1:19 pm, Saturday, 24 October 2026
[gtranslate]
নবজাতকের প্রাপ্য কি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ?

জন্মের আগেই ঋণের দায়

একটি শিশুর জন্ম হলো বাংলাদেশে। তার বাবা হয়তো দিনমজুর, মা সাধারণ একজন গৃহিণী। প্রতিদিনের উপার্জনে কোনোমতে চলে সংসার। কখনো দুবেলা খাবার জোটে, কখনো হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। সেই অভাবের সংসারে নতুন অতিথি এসেছে। শিশুটি জানে না পৃথিবী কী, রাষ্ট্র কী, সরকার কী। টাকা, ঋণ কিংবা সুদের হিসাব বোঝার বয়সও তার হয়নি। অথচ জন্মের পরপরই রাষ্ট্রের বিপুল ঋণের হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তার নামহীন একটি অংশ।

সরকারের মোট ঋণকে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রত্যেক নাগরিকের মাথাপিছু ঋণের একটি হিসাব পাওয়া যায়। এই হিসাব ব্যক্তিগত ঋণ নয়, কোনো নবজাতকের নামে ব্যাংকে খোলা ঋণ হিসাবও নয়। এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক ঋণের বিপরীতে নাগরিকপ্রতি গড় দায়ের একটি পরিমাপ। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্রের নেওয়া ঋণের সুফল যেমন নাগরিকদের পাওয়ার কথা, তেমনি সেই ঋণ পরিশোধের আর্থিক চাপও শেষ পর্যন্ত তাঁদের ওপর পড়ে কেন?

একটি শিশু জন্মের মুহূর্তে কোনো ঋণ নেয় না। সে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়নি, বিদেশি ঋণদাতার সঙ্গে চুক্তি করেনি, ব্যাংক থেকেও অর্থ ধার চায়নি। রাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্তে তার কোনো ভূমিকা নেই। অথচ ভবিষ্যতে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে সে যখন কাজ করবে, আয় করবে এবং কর দেবে, তখন সেই রাজস্বের একটি অংশ দিয়ে রাষ্ট্রের ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যার হাতে নেই, দায়ের একটি অংশ তাকেও বহন করতে হবে। এখানেই রাষ্ট্রীয় ঋণের অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি নৈতিকতা ও জবাবদিহির প্রশ্নটি সামনে আসে।

ঋণ মানেই কি বোঝা?

একটি দেশের ঋণ থাকলেই সেই দেশ ব্যর্থ—এমন সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। আধুনিক অর্থনীতিতে সরকারি ঋণ উন্নয়ন ও জনকল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন-উৎস হতে পারে। অর্থের অভাবে যে হাসপাতাল নির্মাণ সম্ভব হতো না, ঋণের অর্থে তা তৈরি হতে পারে। নির্মিত হতে পারে বিদ্যালয়, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান। বাড়তে পারে উৎপাদন, মানুষের আয় এবং সরকারের রাজস্ব।

এ ধরনের বিনিয়োগের সুফল যদি দীর্ঘদিন ধরে জনগণ পায়, তাহলে ঋণ শুধু বর্তমানের ব্যয় মেটায় না; ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সক্ষমতাও বাড়াতে পারে। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে রাষ্ট্র ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যও তৈরি করতে পারে।

কিন্তু সমস্যার শুরু তখনই, যখন ঋণ নেওয়ার পর তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। কোনো প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অর্থের অপচয় হলে কিংবা প্রকল্প তৈরি হওয়ার পরও মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা না পেলে ঋণের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। অর্থ ব্যয় হয়, দায় থেকে যায়; কিন্তু জনগণের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটে না। তখন ঋণ উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ঋণের সুফল কার, দায় কার?

রাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সাধারণত সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা নেন। কিন্তু ঋণ পরিশোধের অর্থ আসে সরকারি রাজস্ব থেকে, যার বড় উৎস জনগণের দেওয়া কর ও অন্যান্য আয়। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের মতো খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। অবশ্য এর মাত্রা নির্ভর করে সরকারের আয়, ব্যয়ের অগ্রাধিকার, ঋণের শর্ত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

একজন দিনমজুরের কথাই ধরা যাক। সারাদিন শ্রম দিয়ে যে টাকা তিনি উপার্জন করেন, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনতে হয়, সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার ব্যবস্থা করতে হয়। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে তাঁর সংসারের হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় ঋণের সিদ্ধান্তে তাঁর সরাসরি কোনো ভূমিকা না থাকলেও অর্থনীতির ওপর ঋণের চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব থেকে তিনি মুক্ত থাকেন না।

তবে সব নাগরিকের ওপর ঋণের প্রভাব সমান নয়। যাঁদের আয় কম, সঞ্চয় নেই এবং মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, তাঁরা অর্থনৈতিক সংকটের অভিঘাত বেশি অনুভব করতে পারেন। তাই সরকারি ঋণ নিয়ে আলোচনায় শুধু মোট অঙ্ক কিংবা মাথাপিছু হিসাব দেখলেই হবে না; দেখতে হবে এর প্রভাব সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনে কীভাবে পড়ছে।

বিদেশের সঙ্গে তুলনা, কিন্তু কোন মানদণ্ডে?

বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো উন্নত দেশের মাথাপিছু ঋণের তুলনা করা যায়। কিন্তু শুধু অঙ্কের তুলনায় বাস্তব চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। একটি দেশের ঋণ কত, তার পাশাপাশি দেখতে হবে দেশটির অর্থনীতির আকার কত বড়, সরকারের রাজস্ব আয় কত, ঋণের সুদের হার ও মেয়াদ কী, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা কতটা এবং ঋণের অর্থ কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বড় অর্থনীতির একটি দেশ বিপুল ঋণ নিয়েও তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রাখতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলক কম ঋণ নিয়েও কোনো দেশ সমস্যায় পড়তে পারে, যদি তার আয় কম হয়, ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি হয় কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দেয়।

একজন বড় শিল্পোদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা স্থাপন করতে পারেন। সেই কারখানায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মুনাফা সৃষ্টি হলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু একই অঙ্কের ঋণ এমন কোনো কাজে ব্যয় হলে, যেখান থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আয় কিংবা সামাজিক সুফল তৈরি হয় না, সেখানে ঋণের বোঝা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও যুক্তিটি একই। ঋণের পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঋণ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা এবং অর্থ ব্যবহারের ফলাফল। উন্নয়নের নামে কত টাকা ব্যয় হলো, শুধু সেই হিসাব যথেষ্ট নয়; সেই ব্যয়ে মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তারও হিসাব দিতে হবে।

জবাবদিহি ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না

সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। জনগণের জানা প্রয়োজন—কত টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে, কোন উৎস থেকে নেওয়া হচ্ছে, কী শর্তে নেওয়া হচ্ছে, কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে এবং সেই অর্থের বিপরীতে কী সুফল পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিটি বড় প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি ও বাস্তব উপযোগিতা নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি। নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ কেন প্রয়োজন হলো, প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ হলো কি না এবং প্রকল্পটি মানুষের বাস্তব চাহিদা পূরণ করছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকতে হবে। সরকারি নিরীক্ষা, সংসদীয় তদারকি, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ এবং অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এই জবাবদিহির অপরিহার্য অংশ।

ঋণ নেওয়া সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়ও সরকারের রয়েছে। একইভাবে কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা অর্থ অপচয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ সরকারি অর্থের অপচয় শুধু বর্তমানের ক্ষতি নয়; তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

এ আলোচনা কোনো নির্দিষ্ট দল বা সরকারের বিরুদ্ধে নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক প্রশ্ন। সরকার বদলাতে পারে, নীতিনির্ধারকেরা বদলাতে পারেন; কিন্তু রাষ্ট্রের ঋণের দায় ও তার অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। তাই জবাবদিহি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক দায়িত্ব।

নবজাতকের অধিকার, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব

একটি শিশু জন্মের সময় তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভালোবাসা ও নিরাপত্তা চায়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রয়োজন হয় পুষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ পরিবেশ এবং কাজের সুযোগ। সে এমন একটি সমাজ চায়, যেখানে যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মর্যাদা থাকবে, যেখানে অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া যাবে এবং দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যাবে না।

রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করাই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। শুধু বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ, প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে একটি দেশের অগ্রগতি বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছেছে কি না।

আজ যে শিশুটি জন্ম নিল, তার ভবিষ্যৎ যেন শুধু অতীতের ঋণ পরিশোধের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সে যেন এমন একটি অর্থনীতি পায়, যেখানে কর্মসংস্থান থাকবে, উৎপাদন বাড়বে, রাষ্ট্রের আয় বাড়বে এবং জনসেবার মান উন্নত হবে। ঋণের অর্থ যদি এমন ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজে লাগে, তাহলে তার সুফল পরবর্তী প্রজন্মও পাবে। কিন্তু ঋণ নিয়ে যদি কেবল বর্তমানের ব্যয় মেটানো হয়, অথচ ভবিষ্যতের আয় ও সক্ষমতা না বাড়ে, তাহলে সেই দায় পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অন্যায্য চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই রাষ্ট্রের ঋণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে উন্নয়নের বিরোধিতা করা নয়। বরং উন্নয়নকে আরও কার্যকর, টেকসই ও জনকল্যাণমুখী করার দাবি তোলা। ঋণ কত নেওয়া হলো, তার পাশাপাশি জানতে হবে—কেন নেওয়া হলো, কোথায় ব্যয় হলো, কী অর্জিত হলো এবং পরিশোধের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত।

একটি নবজাতক রাষ্ট্রের ঋণ নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। কিন্তু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়েই তাকে বড় হতে হয়। সেই সিদ্ধান্ত যেন তার সম্ভাবনার পথ সংকুচিত না করে, বরং সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়—এ দায়িত্ব আমাদের সবার।

আমরা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঋণের ভারে ন্যুব্জ একটি অর্থনীতি রেখে যেতে চাই, নাকি এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ পরিশ্রম করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে, নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে?

প্রশ্নটি শুধু সরকারের নয়; নীতিনির্ধারক, জনপ্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক—সবার।

নবজাতকের প্রাপ্য ঋণের বোঝা নয়, তার প্রাপ্য একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রের প্রতিটি আর্থিক সিদ্ধান্তে এই সত্যটিই হোক আমাদের বিবেক, দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রধান মানদণ্ড।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে সরকার ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়বে: ইজ্জত উল্লাহ

নবজাতকের প্রাপ্য কি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ?

জন্মের আগেই ঋণের দায়

প্রকাশ 12:24:41 pm, Saturday, 24 October 2026

একটি শিশুর জন্ম হলো বাংলাদেশে। তার বাবা হয়তো দিনমজুর, মা সাধারণ একজন গৃহিণী। প্রতিদিনের উপার্জনে কোনোমতে চলে সংসার। কখনো দুবেলা খাবার জোটে, কখনো হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। সেই অভাবের সংসারে নতুন অতিথি এসেছে। শিশুটি জানে না পৃথিবী কী, রাষ্ট্র কী, সরকার কী। টাকা, ঋণ কিংবা সুদের হিসাব বোঝার বয়সও তার হয়নি। অথচ জন্মের পরপরই রাষ্ট্রের বিপুল ঋণের হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তার নামহীন একটি অংশ।

সরকারের মোট ঋণকে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রত্যেক নাগরিকের মাথাপিছু ঋণের একটি হিসাব পাওয়া যায়। এই হিসাব ব্যক্তিগত ঋণ নয়, কোনো নবজাতকের নামে ব্যাংকে খোলা ঋণ হিসাবও নয়। এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক ঋণের বিপরীতে নাগরিকপ্রতি গড় দায়ের একটি পরিমাপ। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্রের নেওয়া ঋণের সুফল যেমন নাগরিকদের পাওয়ার কথা, তেমনি সেই ঋণ পরিশোধের আর্থিক চাপও শেষ পর্যন্ত তাঁদের ওপর পড়ে কেন?

একটি শিশু জন্মের মুহূর্তে কোনো ঋণ নেয় না। সে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়নি, বিদেশি ঋণদাতার সঙ্গে চুক্তি করেনি, ব্যাংক থেকেও অর্থ ধার চায়নি। রাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্তে তার কোনো ভূমিকা নেই। অথচ ভবিষ্যতে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে সে যখন কাজ করবে, আয় করবে এবং কর দেবে, তখন সেই রাজস্বের একটি অংশ দিয়ে রাষ্ট্রের ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যার হাতে নেই, দায়ের একটি অংশ তাকেও বহন করতে হবে। এখানেই রাষ্ট্রীয় ঋণের অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি নৈতিকতা ও জবাবদিহির প্রশ্নটি সামনে আসে।

ঋণ মানেই কি বোঝা?

একটি দেশের ঋণ থাকলেই সেই দেশ ব্যর্থ—এমন সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। আধুনিক অর্থনীতিতে সরকারি ঋণ উন্নয়ন ও জনকল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন-উৎস হতে পারে। অর্থের অভাবে যে হাসপাতাল নির্মাণ সম্ভব হতো না, ঋণের অর্থে তা তৈরি হতে পারে। নির্মিত হতে পারে বিদ্যালয়, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান। বাড়তে পারে উৎপাদন, মানুষের আয় এবং সরকারের রাজস্ব।

এ ধরনের বিনিয়োগের সুফল যদি দীর্ঘদিন ধরে জনগণ পায়, তাহলে ঋণ শুধু বর্তমানের ব্যয় মেটায় না; ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সক্ষমতাও বাড়াতে পারে। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে রাষ্ট্র ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যও তৈরি করতে পারে।

কিন্তু সমস্যার শুরু তখনই, যখন ঋণ নেওয়ার পর তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। কোনো প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অর্থের অপচয় হলে কিংবা প্রকল্প তৈরি হওয়ার পরও মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা না পেলে ঋণের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। অর্থ ব্যয় হয়, দায় থেকে যায়; কিন্তু জনগণের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটে না। তখন ঋণ উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ঋণের সুফল কার, দায় কার?

রাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সাধারণত সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা নেন। কিন্তু ঋণ পরিশোধের অর্থ আসে সরকারি রাজস্ব থেকে, যার বড় উৎস জনগণের দেওয়া কর ও অন্যান্য আয়। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের মতো খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। অবশ্য এর মাত্রা নির্ভর করে সরকারের আয়, ব্যয়ের অগ্রাধিকার, ঋণের শর্ত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

একজন দিনমজুরের কথাই ধরা যাক। সারাদিন শ্রম দিয়ে যে টাকা তিনি উপার্জন করেন, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনতে হয়, সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার ব্যবস্থা করতে হয়। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে তাঁর সংসারের হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় ঋণের সিদ্ধান্তে তাঁর সরাসরি কোনো ভূমিকা না থাকলেও অর্থনীতির ওপর ঋণের চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব থেকে তিনি মুক্ত থাকেন না।

তবে সব নাগরিকের ওপর ঋণের প্রভাব সমান নয়। যাঁদের আয় কম, সঞ্চয় নেই এবং মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, তাঁরা অর্থনৈতিক সংকটের অভিঘাত বেশি অনুভব করতে পারেন। তাই সরকারি ঋণ নিয়ে আলোচনায় শুধু মোট অঙ্ক কিংবা মাথাপিছু হিসাব দেখলেই হবে না; দেখতে হবে এর প্রভাব সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনে কীভাবে পড়ছে।

বিদেশের সঙ্গে তুলনা, কিন্তু কোন মানদণ্ডে?

বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো উন্নত দেশের মাথাপিছু ঋণের তুলনা করা যায়। কিন্তু শুধু অঙ্কের তুলনায় বাস্তব চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। একটি দেশের ঋণ কত, তার পাশাপাশি দেখতে হবে দেশটির অর্থনীতির আকার কত বড়, সরকারের রাজস্ব আয় কত, ঋণের সুদের হার ও মেয়াদ কী, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা কতটা এবং ঋণের অর্থ কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বড় অর্থনীতির একটি দেশ বিপুল ঋণ নিয়েও তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রাখতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলক কম ঋণ নিয়েও কোনো দেশ সমস্যায় পড়তে পারে, যদি তার আয় কম হয়, ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি হয় কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দেয়।

একজন বড় শিল্পোদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা স্থাপন করতে পারেন। সেই কারখানায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মুনাফা সৃষ্টি হলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু একই অঙ্কের ঋণ এমন কোনো কাজে ব্যয় হলে, যেখান থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আয় কিংবা সামাজিক সুফল তৈরি হয় না, সেখানে ঋণের বোঝা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও যুক্তিটি একই। ঋণের পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঋণ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা এবং অর্থ ব্যবহারের ফলাফল। উন্নয়নের নামে কত টাকা ব্যয় হলো, শুধু সেই হিসাব যথেষ্ট নয়; সেই ব্যয়ে মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তারও হিসাব দিতে হবে।

জবাবদিহি ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না

সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। জনগণের জানা প্রয়োজন—কত টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে, কোন উৎস থেকে নেওয়া হচ্ছে, কী শর্তে নেওয়া হচ্ছে, কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে এবং সেই অর্থের বিপরীতে কী সুফল পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিটি বড় প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি ও বাস্তব উপযোগিতা নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি। নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ কেন প্রয়োজন হলো, প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ হলো কি না এবং প্রকল্পটি মানুষের বাস্তব চাহিদা পূরণ করছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকতে হবে। সরকারি নিরীক্ষা, সংসদীয় তদারকি, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ এবং অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এই জবাবদিহির অপরিহার্য অংশ।

ঋণ নেওয়া সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়ও সরকারের রয়েছে। একইভাবে কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা অর্থ অপচয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ সরকারি অর্থের অপচয় শুধু বর্তমানের ক্ষতি নয়; তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

এ আলোচনা কোনো নির্দিষ্ট দল বা সরকারের বিরুদ্ধে নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক প্রশ্ন। সরকার বদলাতে পারে, নীতিনির্ধারকেরা বদলাতে পারেন; কিন্তু রাষ্ট্রের ঋণের দায় ও তার অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। তাই জবাবদিহি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক দায়িত্ব।

নবজাতকের অধিকার, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব

একটি শিশু জন্মের সময় তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভালোবাসা ও নিরাপত্তা চায়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রয়োজন হয় পুষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ পরিবেশ এবং কাজের সুযোগ। সে এমন একটি সমাজ চায়, যেখানে যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মর্যাদা থাকবে, যেখানে অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া যাবে এবং দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যাবে না।

রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করাই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। শুধু বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ, প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে একটি দেশের অগ্রগতি বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছেছে কি না।

আজ যে শিশুটি জন্ম নিল, তার ভবিষ্যৎ যেন শুধু অতীতের ঋণ পরিশোধের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সে যেন এমন একটি অর্থনীতি পায়, যেখানে কর্মসংস্থান থাকবে, উৎপাদন বাড়বে, রাষ্ট্রের আয় বাড়বে এবং জনসেবার মান উন্নত হবে। ঋণের অর্থ যদি এমন ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজে লাগে, তাহলে তার সুফল পরবর্তী প্রজন্মও পাবে। কিন্তু ঋণ নিয়ে যদি কেবল বর্তমানের ব্যয় মেটানো হয়, অথচ ভবিষ্যতের আয় ও সক্ষমতা না বাড়ে, তাহলে সেই দায় পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অন্যায্য চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই রাষ্ট্রের ঋণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে উন্নয়নের বিরোধিতা করা নয়। বরং উন্নয়নকে আরও কার্যকর, টেকসই ও জনকল্যাণমুখী করার দাবি তোলা। ঋণ কত নেওয়া হলো, তার পাশাপাশি জানতে হবে—কেন নেওয়া হলো, কোথায় ব্যয় হলো, কী অর্জিত হলো এবং পরিশোধের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত।

একটি নবজাতক রাষ্ট্রের ঋণ নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। কিন্তু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়েই তাকে বড় হতে হয়। সেই সিদ্ধান্ত যেন তার সম্ভাবনার পথ সংকুচিত না করে, বরং সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়—এ দায়িত্ব আমাদের সবার।

আমরা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঋণের ভারে ন্যুব্জ একটি অর্থনীতি রেখে যেতে চাই, নাকি এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ পরিশ্রম করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে, নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে?

প্রশ্নটি শুধু সরকারের নয়; নীতিনির্ধারক, জনপ্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক—সবার।

নবজাতকের প্রাপ্য ঋণের বোঝা নয়, তার প্রাপ্য একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রের প্রতিটি আর্থিক সিদ্ধান্তে এই সত্যটিই হোক আমাদের বিবেক, দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রধান মানদণ্ড।