Dhaka রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯৭১-২০২৬: রাষ্ট্রপতির চেয়ারে যারা ছিলেন

৫৫ বছরে বাংলাদেশের সব রাষ্ট্রপতির অজানা ইতিহাস

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৪:৫২:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
  • / ৪ বার দেখা হয়েছে

একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক পালাবদলের গল্প নয়। সেই ইতিহাস গড়ে ওঠে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, সময়ের চ্যালেঞ্জ এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদও গত ৫৫ বছরে এমন বহু ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে আছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রকে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় একটি সাংবিধানিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সেই পথচলায় রাষ্ট্রপতির পদ হয়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অন্যতম প্রতীক।

১৯৭১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ব, বিচারপতি, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কেরা। কেউ দায়িত্ব নিয়েছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের সময়ে, কেউ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে, আবার কেউ গণতন্ত্রের উত্তরণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রপতি: স্বাধীনতার প্রথম অধ্যায়

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথ নেয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত।

এই সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তবে স্বাধীনতার সংগ্রামের সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন (১৯৭২-১৯৭৫)

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এর দুই দিন পর, ১২ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একই দিনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।

তাঁর সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পথে এগিয়ে যায় এবং নতুন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ।

তবে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কিন্তু মাত্র কয়েক মাস পর, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। এক সামরিক অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের অধ্যায় (১৯৭৫-১৯৯০)

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতি প্রবেশ করে এক অনিশ্চিত সময়ে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তাঁর শাসনকাল ছিল স্বল্পস্থায়ী।

একই বছরের নভেম্বরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান।

তাঁর সময়ে বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন উদ্যোগ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের চেষ্টা দেখা যায়। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।

এরপর আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

এরশাদের প্রায় নয় বছরের শাসনের অবসান ঘটে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতির যুগ (১৯৯১-২০২৬)

১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতির পদ মূলত সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছে।

এই সময়ে দায়িত্ব পালন করেন—

বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আবদুর রহমান বিশ্বাস

১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।

এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী

২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে তাঁর মেয়াদ ছিল অল্প সময়ের।

মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

ইয়াজউদ্দিন আহমদ

২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সময়ে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হয়।

জিল্লুর রহমান

২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর সময়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘটনা ঘটে।

আবদুল হামিদ

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দুই মেয়াদে ১০ বছর দায়িত্ব পালন করে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতি হন।

সাম্প্রতিক সময়: মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন থেকে হাফিজ উদ্দিন আহমদ

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তাঁর দায়িত্বকাল ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেয়াদ শেষ হয়। একই দিনে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।

রাষ্ট্রপতির পদ: রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার প্রতীক

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ইতিহাস শুধু কয়েকজন ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের তালিকা নয়। এটি একটি দেশের জন্ম, সংগ্রাম, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার দলিল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদ বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছে।

সময় বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের এই দীর্ঘ যাত্রা মনে করিয়ে দেয়—একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথে নেতৃত্ব, দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতার গুরুত্ব কতটা গভীর।

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

১৯৭১-২০২৬: রাষ্ট্রপতির চেয়ারে যারা ছিলেন

৫৫ বছরে বাংলাদেশের সব রাষ্ট্রপতির অজানা ইতিহাস

প্রকাশের সময় ০৪:৫২:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক পালাবদলের গল্প নয়। সেই ইতিহাস গড়ে ওঠে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, সময়ের চ্যালেঞ্জ এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদও গত ৫৫ বছরে এমন বহু ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে আছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রকে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় একটি সাংবিধানিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সেই পথচলায় রাষ্ট্রপতির পদ হয়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অন্যতম প্রতীক।

১৯৭১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ব, বিচারপতি, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কেরা। কেউ দায়িত্ব নিয়েছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের সময়ে, কেউ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে, আবার কেউ গণতন্ত্রের উত্তরণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রপতি: স্বাধীনতার প্রথম অধ্যায়

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথ নেয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত।

এই সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তবে স্বাধীনতার সংগ্রামের সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন (১৯৭২-১৯৭৫)

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এর দুই দিন পর, ১২ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একই দিনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।

তাঁর সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পথে এগিয়ে যায় এবং নতুন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ।

তবে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কিন্তু মাত্র কয়েক মাস পর, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। এক সামরিক অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের অধ্যায় (১৯৭৫-১৯৯০)

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতি প্রবেশ করে এক অনিশ্চিত সময়ে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তাঁর শাসনকাল ছিল স্বল্পস্থায়ী।

একই বছরের নভেম্বরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান।

তাঁর সময়ে বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন উদ্যোগ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের চেষ্টা দেখা যায়। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।

এরপর আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

এরশাদের প্রায় নয় বছরের শাসনের অবসান ঘটে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতির যুগ (১৯৯১-২০২৬)

১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতির পদ মূলত সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছে।

এই সময়ে দায়িত্ব পালন করেন—

বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আবদুর রহমান বিশ্বাস

১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।

এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী

২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে তাঁর মেয়াদ ছিল অল্প সময়ের।

মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

ইয়াজউদ্দিন আহমদ

২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সময়ে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হয়।

জিল্লুর রহমান

২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর সময়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘটনা ঘটে।

আবদুল হামিদ

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দুই মেয়াদে ১০ বছর দায়িত্ব পালন করে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতি হন।

সাম্প্রতিক সময়: মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন থেকে হাফিজ উদ্দিন আহমদ

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তাঁর দায়িত্বকাল ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেয়াদ শেষ হয়। একই দিনে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।

রাষ্ট্রপতির পদ: রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার প্রতীক

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ইতিহাস শুধু কয়েকজন ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের তালিকা নয়। এটি একটি দেশের জন্ম, সংগ্রাম, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার দলিল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদ বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছে।

সময় বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের এই দীর্ঘ যাত্রা মনে করিয়ে দেয়—একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথে নেতৃত্ব, দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতার গুরুত্ব কতটা গভীর।