বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই বাড়ছে দক্ষ নার্সের চাহিদা। হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র—সবখানেই এখন নার্সদের ভূমিকা কেন্দ্রীয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এই চাহিদার বিপরীতে বিশ্বে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ঘাটতি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ নার্স কর্মরত থাকলেও ২০৩০ সালের মধ্যে আরও প্রায় ৪৫ লাখ নার্সের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই ঘাটতি শুধু সংখ্যা নয়, স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
বাংলাদেশে নার্সিং খাতে অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য এখনও তৈরি হয়নি। দেশে বর্তমানে চিকিৎসকের তুলনায় নার্সের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নয়। যেখানে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার কথা, সেখানে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
দেশে চিকিৎসক, দন্তচিকিৎসক ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পাশাপাশি নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা থাকলেও সেই অনুপাতে সেবা কাঠামো এখনো দুর্বল। ফলে হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় চাপ পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু সংখ্যার সমস্যা নয়—এটি দক্ষতার কাঠামোগত ঘাটতির বিষয়ও।
বিশ্ববাজারে বড় সুযোগ, কিন্তু প্রস্তুতি কতটা?
বর্তমানে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ নার্সের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে প্রশিক্ষিত নার্সের সংকট তীব্র।
তবে এই চাহিদা সাধারণ নার্সিং দক্ষতায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব এখন খুঁজছে—
- আইসিইউ নার্স
- অপারেশন থিয়েটার (OT) নার্স
- ক্লিনিক্যাল স্পেশালিস্ট নার্স
অর্থাৎ, শুধু সাধারণ ডিগ্রি নয়—প্রয়োজন বিশেষায়িত দক্ষতা।
বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাড়লেও সেই মানের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এখনও সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন অনেকেই।
বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন ৪৬৪টি নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজ রয়েছে। এক দশক আগেও এই সংখ্যা ছিল এর এক-চতুর্থাংশের কম।
এই সম্প্রসারণ নার্সিং শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ারই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যার পাশাপাশি মান উন্নয়ন না হলে এই সম্ভাবনা পূর্ণতা পাবে না।
দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত নার্সদের একটি অংশ সরকারি চাকরিতে থাকলেও বড় একটি অংশ বেসরকারি খাত ও অনিশ্চিত কর্মপরিস্থিতিতে রয়েছে। আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নার্স বেকারও আছেন।
অন্যদিকে বিদেশে নার্সিং পেশায় কাজের সুযোগ থাকলেও ভাষা দক্ষতা, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের অভাবে অনেকেই সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যদি নার্সিং খাতকে কৌশলগতভাবে উন্নয়ন করে, তাহলে এটি হতে পারে একটি বড় মানবসম্পদ রপ্তানি খাত। এজন্য প্রয়োজন—
- আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ
- বিশেষায়িত নার্সিং কোর্স
- বিদেশি ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন
- সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ
স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে না, এর পেছনের নীরব শক্তি হলো নার্সরা। বিশ্ব যখন দক্ষ নার্সের সংকটে ভুগছে, তখন বাংলাদেশ এই খাতে বড় সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশ্ন হলো—এই সম্ভাবনাকে আমরা কতটা প্রস্তুতভাবে কাজে লাগাতে পারব।