Dhaka বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রেম, বিরহ ও দ্রোহে গড়া এক কবিজীবন

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৮:০৯:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • / ৯৮ বার দেখা হয়েছে

সাহিত্যপাতা

বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি প্রেমেরও কবি। তাঁর কবিতায় যেমন শোষণের বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ আছে, তেমনি আছে প্রেমে ভাঙা হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস। তাই নজরুলকে বুঝতে হলে শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পড়লেই হয় না, জানতে হয় তাঁর প্রেম, বেদনা ও ব্যক্তিজীবনের গল্পও। নজরুলের জীবন ছিল অস্থির, বর্ণিল ও আবেগময়। সেই জীবনে প্রেম এসেছে বারবার। কখনও তা তাঁকে উন্মাতাল করেছে, কখনও দিয়েছে গভীর বিষাদ। আর সেই প্রেমের ছোঁয়াই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা। তিনি যেসব নারীকে ভালোবেসেছিলেন, তাঁদের ঘিরেই জন্ম নিয়েছে তাঁর বহু গান, কবিতা ও চিঠি।

  • দৌলতপুরের সেই প্রেম:

১৯২১ সালের মার্চ কিংবা এপ্রিল মাস। কুমিল্লার দৌলতপুরে বন্ধু আলী আকবর খানের আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন নজরুল। সেখানে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় সৈয়দা খাতুন নামের এক তরুণীর সঙ্গে। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছিলেন কবি। তাঁর কণ্ঠ, সুর আর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে পড়েন সেই তরুণী। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়েছিলেন নজরুলও। সৈয়দা খাতুনকে ভালোবেসে কবি নাম দেন ‘নার্গিস’। ফারসি ভাষায় যার অর্থ সাদা ফুল। নজরুল গবেষকদের কাছে এই নার্গিসের গুরুত্ব আলাদা। কারণ, তিনিই ছিলেন কবিজীবনের প্রথম বড় প্রেম। দৌলতপুরে অবস্থানকালেই নজরুল সিদ্ধান্ত নেন নার্গিসকে বিয়ে করবেন। পরে তাঁদের বিয়েও হয়। কিন্তু সেই সংসার সুখের হয়নি। বিয়ের রাতেই অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান কবি। কেন সেই অভিমান, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আজও মেলেনি। তবে গবেষকেরা মনে করেন, এই বিচ্ছেদ নজরুলকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর বহু বিরহের গান ও কবিতায় সেই কষ্টের প্রতিফলন দেখা যায়।

  • প্রত্যাখ্যাত প্রেমের বেদনা:

নজরুলের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম ফজিলাতুন্নেছা। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম স্নাতকোত্তর ছাত্রীদের একজন। ১৯২৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের এক সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন নজরুল। বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেন তাঁকে নিয়ে যান ফজিলাতুন্নেসার বাসায়। সেখান থেকেই শুরু। শিক্ষিত, মার্জিত ও আধুনিক চিন্তার এই নারীকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেন কবি। কিন্তু এই প্রেম পূর্ণতা পায়নি। ফজিলাতুন্নেসা তাঁর প্রেমের আহ্বানে সাড়া দেননি। তবু থেমে থাকেননি নজরুল। একের পর এক চিঠি লিখেছেন তাঁকে। নিজের হাতে না পাঠিয়ে বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে পাঠাতেন সেই চিঠি। এক চিঠিতে নজরুল লিখেছিলেন, “একটি চিঠি পেয়েই বুঝেছি, তিনি দ্বিতীয় চিঠি দিয়ে আমাকে দয়া করবেন না।” এই অপূর্ণ প্রেম কবির মনে দীর্ঘদিন বেদনা হয়ে ছিল বলে মনে করেন গবেষকেরা।

  • কলকাতার আলোছায়া:

তখন কলকাতার সাহিত্য ও সংগীতাঙ্গনে নজরুল এক উজ্জ্বল নাম। সংগীতজ্ঞ দীলিপ কুমার রায়ের সূত্রে রানু নামে এক তরুণীকে গান শেখাতে শুরু করেন কবি। সেই পরিচয় থেকে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিনেত্রী ও গায়িকা কানন দেবী-কেও গান শিখিয়েছিলেন নজরুল। তাঁকে ঘিরেও কলকাতার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছিল। যদিও এসব আলোচনার সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এটুকু স্পষ্ট, প্রেম, সৌন্দর্য ও নারীর উপস্থিতি নজরুলের সৃষ্টিশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

  • প্রমীলা: ঝড়ের জীবনে আশ্রয়:

সবশেষে যে নারী নজরুলের জীবনে স্থায়ী হয়ে ওঠেন, তিনি প্রমীলা দেবী। তাঁর ডাকনাম ছিল দুলি। ১৯২৪ সালের এপ্রিলে তাঁদের বিয়ে হয়। তখন নজরুলের বয়স ২৩, প্রমীলার ১৪। এই বিয়ে নিয়ে সমাজে কম বিতর্ক হয়নি। ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে অনেকেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। তবে সব বাধা অতিক্রম করে সংসার শুরু করেছিলেন তাঁরা। নজরুলের বিখ্যাত ‘বিজয়িনী’ কবিতায় প্রমীলার প্রতি তাঁর ভালোবাসার ছাপ পাওয়া যায়। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেও প্রমীলা ছিলেন কবির পাশে। অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এই সম্পর্ক টিকে ছিল গভীর মমতায়।

  • দ্রোহের ভেতরে যে প্রেম লুকিয়ে ছিল:

কাজী নজরুল ইসলাম-এর সাহিত্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর প্রেম, বিদ্রোহ, মানবতা ও বেদনা—সব মিলেই তিনি নজরুল। তিনি যেমন লিখেছেন শৃঙ্খল ভাঙার গান, তেমনি লিখেছেন হৃদয় ভাঙার বেদনাও। তাঁর প্রেম ছিল উন্মাতাল, আবার গভীরভাবে মানবিকও। সম্ভবত এ কারণেই শত বছর পরও নজরুল এতটা প্রাসঙ্গিক। প্রেমে ব্যথিত মানুষ তাঁর কবিতায় সান্ত্বনা খুঁজে পায়, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাওয়া মানুষ খুঁজে পায় সাহস।

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

প্রেম, বিরহ ও দ্রোহে গড়া এক কবিজীবন

প্রকাশের সময় ০৮:০৯:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি প্রেমেরও কবি। তাঁর কবিতায় যেমন শোষণের বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ আছে, তেমনি আছে প্রেমে ভাঙা হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস। তাই নজরুলকে বুঝতে হলে শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পড়লেই হয় না, জানতে হয় তাঁর প্রেম, বেদনা ও ব্যক্তিজীবনের গল্পও। নজরুলের জীবন ছিল অস্থির, বর্ণিল ও আবেগময়। সেই জীবনে প্রেম এসেছে বারবার। কখনও তা তাঁকে উন্মাতাল করেছে, কখনও দিয়েছে গভীর বিষাদ। আর সেই প্রেমের ছোঁয়াই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা। তিনি যেসব নারীকে ভালোবেসেছিলেন, তাঁদের ঘিরেই জন্ম নিয়েছে তাঁর বহু গান, কবিতা ও চিঠি।

  • দৌলতপুরের সেই প্রেম:

১৯২১ সালের মার্চ কিংবা এপ্রিল মাস। কুমিল্লার দৌলতপুরে বন্ধু আলী আকবর খানের আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন নজরুল। সেখানে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় সৈয়দা খাতুন নামের এক তরুণীর সঙ্গে। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছিলেন কবি। তাঁর কণ্ঠ, সুর আর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে পড়েন সেই তরুণী। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়েছিলেন নজরুলও। সৈয়দা খাতুনকে ভালোবেসে কবি নাম দেন ‘নার্গিস’। ফারসি ভাষায় যার অর্থ সাদা ফুল। নজরুল গবেষকদের কাছে এই নার্গিসের গুরুত্ব আলাদা। কারণ, তিনিই ছিলেন কবিজীবনের প্রথম বড় প্রেম। দৌলতপুরে অবস্থানকালেই নজরুল সিদ্ধান্ত নেন নার্গিসকে বিয়ে করবেন। পরে তাঁদের বিয়েও হয়। কিন্তু সেই সংসার সুখের হয়নি। বিয়ের রাতেই অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান কবি। কেন সেই অভিমান, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আজও মেলেনি। তবে গবেষকেরা মনে করেন, এই বিচ্ছেদ নজরুলকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর বহু বিরহের গান ও কবিতায় সেই কষ্টের প্রতিফলন দেখা যায়।

  • প্রত্যাখ্যাত প্রেমের বেদনা:

নজরুলের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম ফজিলাতুন্নেছা। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম স্নাতকোত্তর ছাত্রীদের একজন। ১৯২৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের এক সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন নজরুল। বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেন তাঁকে নিয়ে যান ফজিলাতুন্নেসার বাসায়। সেখান থেকেই শুরু। শিক্ষিত, মার্জিত ও আধুনিক চিন্তার এই নারীকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেন কবি। কিন্তু এই প্রেম পূর্ণতা পায়নি। ফজিলাতুন্নেসা তাঁর প্রেমের আহ্বানে সাড়া দেননি। তবু থেমে থাকেননি নজরুল। একের পর এক চিঠি লিখেছেন তাঁকে। নিজের হাতে না পাঠিয়ে বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে পাঠাতেন সেই চিঠি। এক চিঠিতে নজরুল লিখেছিলেন, “একটি চিঠি পেয়েই বুঝেছি, তিনি দ্বিতীয় চিঠি দিয়ে আমাকে দয়া করবেন না।” এই অপূর্ণ প্রেম কবির মনে দীর্ঘদিন বেদনা হয়ে ছিল বলে মনে করেন গবেষকেরা।

  • কলকাতার আলোছায়া:

তখন কলকাতার সাহিত্য ও সংগীতাঙ্গনে নজরুল এক উজ্জ্বল নাম। সংগীতজ্ঞ দীলিপ কুমার রায়ের সূত্রে রানু নামে এক তরুণীকে গান শেখাতে শুরু করেন কবি। সেই পরিচয় থেকে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিনেত্রী ও গায়িকা কানন দেবী-কেও গান শিখিয়েছিলেন নজরুল। তাঁকে ঘিরেও কলকাতার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছিল। যদিও এসব আলোচনার সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এটুকু স্পষ্ট, প্রেম, সৌন্দর্য ও নারীর উপস্থিতি নজরুলের সৃষ্টিশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

  • প্রমীলা: ঝড়ের জীবনে আশ্রয়:

সবশেষে যে নারী নজরুলের জীবনে স্থায়ী হয়ে ওঠেন, তিনি প্রমীলা দেবী। তাঁর ডাকনাম ছিল দুলি। ১৯২৪ সালের এপ্রিলে তাঁদের বিয়ে হয়। তখন নজরুলের বয়স ২৩, প্রমীলার ১৪। এই বিয়ে নিয়ে সমাজে কম বিতর্ক হয়নি। ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে অনেকেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। তবে সব বাধা অতিক্রম করে সংসার শুরু করেছিলেন তাঁরা। নজরুলের বিখ্যাত ‘বিজয়িনী’ কবিতায় প্রমীলার প্রতি তাঁর ভালোবাসার ছাপ পাওয়া যায়। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেও প্রমীলা ছিলেন কবির পাশে। অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এই সম্পর্ক টিকে ছিল গভীর মমতায়।

  • দ্রোহের ভেতরে যে প্রেম লুকিয়ে ছিল:

কাজী নজরুল ইসলাম-এর সাহিত্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর প্রেম, বিদ্রোহ, মানবতা ও বেদনা—সব মিলেই তিনি নজরুল। তিনি যেমন লিখেছেন শৃঙ্খল ভাঙার গান, তেমনি লিখেছেন হৃদয় ভাঙার বেদনাও। তাঁর প্রেম ছিল উন্মাতাল, আবার গভীরভাবে মানবিকও। সম্ভবত এ কারণেই শত বছর পরও নজরুল এতটা প্রাসঙ্গিক। প্রেমে ব্যথিত মানুষ তাঁর কবিতায় সান্ত্বনা খুঁজে পায়, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাওয়া মানুষ খুঁজে পায় সাহস।