Dhaka মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকতার অন্দরমহল: সৎ মানুষের লড়াই কার বিরুদ্ধে?

টেলিভিশনের পর্দায় পরিপাটি পোশাকে একজন সাংবাদিক নীতিকথা শোনাচ্ছেন। আরেকজন পত্রিকার পাতায় কলামের পর কলাম লিখে সত্য, ন্যায় ও আদর্শের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। তাঁদের কথায় সমাজ বদলের স্বপ্ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। পাঠক ও দর্শকের চোখে তাঁরা হয়ে ওঠেন আদর্শ সাংবাদিকতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পর্দার সেই মোলায়েম হাসি আর নীতিবাক্যের সঙ্গে বাস্তব জীবনের কতটা মিল রয়েছে?

সাংবাদিকতার অন্দরমহল সম্পর্কে সাধারণ পাঠকের ধারণা সীমিত। সংবাদ প্রকাশের পেছনে থাকে অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই, সম্পাদনা, চাপ মোকাবিলা ও নিরলস পরিশ্রম। কিন্তু এর পাশাপাশি কোথাও কোথাও থাকে পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা, ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা, ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং পেশাগত নীতির সঙ্গে আপসের অভিযোগ। এসব প্রবণতা সব সাংবাদিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবু যেখানে এমন অনিয়ম রয়েছে, সেখানে তা নিয়ে আত্মসমালোচনা জরুরি।

একজন সৎ সাংবাদিকের লড়াই সাধারণত সত্য প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো প্রভাবশালী মহলের অসন্তোষ, কখনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থের মুখোমুখি হতে হয়। এর বাইরেও পেশার ভেতরে প্রতিযোগিতা, সহকর্মীদের অসহযোগিতা কিংবা যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার মতো পরিস্থিতি তাঁর কাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেলে প্রকৃত মেধা আড়ালে থেকে যায়।

সাংবাদিকতার এই বাস্তবতা বোঝাতে আমরা রূপক অর্থে দুটি শ্রেণির কথা বলতে পারি। একদিকে রয়েছেন সেই সাংবাদিকেরা, যাঁরা কাজ, সততা ও পেশাগত দক্ষতাকে প্রধান বিবেচনা করেন। অন্যদিকে রয়েছেন এমন কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি, যাঁদের বিরুদ্ধে পেশাগত দায়িত্বের চেয়ে পদ-পদবি, প্রভাব বিস্তার ও ব্যক্তিগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই বিভাজন কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিন্যাস নয়; বরং সাংবাদিকতার নৈতিক সংকট বোঝার একটি রূপক।

সমস্যা হলো, কর্মদক্ষতা সব সময় সাংগঠনিক প্রভাব নিশ্চিত করে না। যাঁরা নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান, সম্পাদনা ও তথ্য যাচাইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাঁরা অনেক সময় নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। ফলে পেশাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাঁদের প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, যাঁরা সংগঠন পরিচালনা, যোগাযোগ রক্ষা ও নেতৃত্বের কাঠামোয় সক্রিয়, তাঁরা তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন।

প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক সংগঠন কিংবা গণমাধ্যমের বিভিন্ন পেশাজীবী প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এসব প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কোনো সংগঠন যদি ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, পদ ধরে রাখা কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে তার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সংগঠনের নেতৃত্বের মূল্যায়ন হওয়া উচিত কাজ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে।

গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ ও সম্পাদকের দায়িত্বও এখানে কম নয়। একটি সংবাদমাধ্যমের সাফল্য কেবল পর্দায় পরিচিত মুখের উপস্থিতি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার যোগাযোগ কতটা ঘনিষ্ঠ, তার ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে থাকে প্রতিবেদক, উপসম্পাদক, সংবাদ সম্পাদক, আলোকচিত্রী, ভিডিও সাংবাদিক এবং অসংখ্য কর্মীর সম্মিলিত শ্রম। যাঁরা মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন, ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ তৈরি করেন এবং নির্ভুলতার জন্য বারবার যাচাই করেন, তাঁদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন।

কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি তোষামোদ পেশাগত দক্ষতার বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে সঠিক মূল্যায়নের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে যোগ্য কর্মীরা নিরুৎসাহিত হন, নতুন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ কমে যায় এবং প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তাই সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্বে প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগ, কাজের ন্যায্য মূল্যায়ন, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা।

গণমাধ্যম শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট বিনিয়োগ ও বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়ে গেলে কিংবা ব্যবসায়িক ও পেশাগত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে নতুন উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা বা প্রতারণার অভিযোগ থাকলে সেগুলোর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া পুরো গণমাধ্যম শিল্পকে বিনিয়োগ-অনুপযোগী বা প্রতারণাপ্রবণ বলে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রথম শর্ত হলো, সৎ ও দক্ষ সাংবাদিকদের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠা। পেশাগত অধিকার, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে তাঁদের সম্মিলিত অবস্থান প্রয়োজন। তবে সেই ঐক্য যেন আরেকটি গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। উদ্দেশ্য হতে হবে কাউকে হেয় করা কিংবা ক্ষমতার পালাবদল ঘটানো নয়; বরং পেশাগত মান উন্নয়ন, নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা।

সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সদস্যদের দক্ষতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত অবদানের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সংবাদমাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকদের নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে মতপ্রকাশের সুযোগ থাকবে এবং কোনো কর্মীকে ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে বিচার করা হবে না। একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও নিজেদের কাজের জবাবদিহি মেনে নিতে হবে। ভুল সংবাদ প্রকাশিত হলে সংশোধন, অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই এবং স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা পেশাগত দায়িত্বের অংশ।

পাঠকেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিচিতি, জনপ্রিয়তা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় উপস্থিতির ভিত্তিতে কাউকে আদর্শ সাংবাদিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অসৎ বলাও ন্যায়সংগত নয়। সাংবাদিকতার মূল্যায়ন করতে হবে প্রকাশিত সংবাদ, তথ্যের নির্ভুলতা, নৈতিক অবস্থান এবং দায়িত্ব পালনের প্রমাণের ভিত্তিতে।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সাংবাদিকদের নিজেদের পেশার মর্যাদাও রক্ষা করতে হবে। পেশার ভেতরে অনিয়ম থাকলে তা আড়াল করা নয়, যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকাশ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের নিজেদের ক্ষেত্রেও একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। কারণ, নীতি কেবল অন্যকে উপদেশ দেওয়ার বিষয় নয়; তা নিজের আচরণে প্রতিষ্ঠা করারও বিষয়।

গণমাধ্যমের সংকট থেকে উত্তরণের পথ কোনো একক ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের হাতে নেই। প্রয়োজন পেশাগত সততা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, ন্যায্য মূল্যায়ন, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। সৎ সাংবাদিকেরা যদি নিজেদের কাজের পাশাপাশি পেশার বৃহত্তর স্বার্থেও সক্রিয় হন, আর সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্ব যদি যোগ্যতা ও সততাকে যথাযথ মর্যাদা দেয়, তবে পরিবর্তনের বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে।

শেষ পর্যন্ত একজন সাংবাদিকের পরিচয় তাঁর পোশাক, পদবি, বক্তব্য কিংবা সংগঠনের পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় তাঁর কাজ, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার সক্ষমতায়। সাংবাদিকতার অন্দরমহলে যে সংকটই থাকুক, তার সমাধান কাউকে অন্ধভাবে নায়ক কিংবা খলনায়ক বানানো নয়; বরং প্রমাণ, ন্যায় ও পেশাগত নৈতিকতার ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

সাংবাদিকতার অন্দরমহল: সৎ মানুষের লড়াই কার বিরুদ্ধে?

প্রকাশের সময় ০৪:৫২:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

টেলিভিশনের পর্দায় পরিপাটি পোশাকে একজন সাংবাদিক নীতিকথা শোনাচ্ছেন। আরেকজন পত্রিকার পাতায় কলামের পর কলাম লিখে সত্য, ন্যায় ও আদর্শের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। তাঁদের কথায় সমাজ বদলের স্বপ্ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। পাঠক ও দর্শকের চোখে তাঁরা হয়ে ওঠেন আদর্শ সাংবাদিকতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পর্দার সেই মোলায়েম হাসি আর নীতিবাক্যের সঙ্গে বাস্তব জীবনের কতটা মিল রয়েছে?

সাংবাদিকতার অন্দরমহল সম্পর্কে সাধারণ পাঠকের ধারণা সীমিত। সংবাদ প্রকাশের পেছনে থাকে অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই, সম্পাদনা, চাপ মোকাবিলা ও নিরলস পরিশ্রম। কিন্তু এর পাশাপাশি কোথাও কোথাও থাকে পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা, ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা, ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং পেশাগত নীতির সঙ্গে আপসের অভিযোগ। এসব প্রবণতা সব সাংবাদিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবু যেখানে এমন অনিয়ম রয়েছে, সেখানে তা নিয়ে আত্মসমালোচনা জরুরি।

একজন সৎ সাংবাদিকের লড়াই সাধারণত সত্য প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো প্রভাবশালী মহলের অসন্তোষ, কখনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থের মুখোমুখি হতে হয়। এর বাইরেও পেশার ভেতরে প্রতিযোগিতা, সহকর্মীদের অসহযোগিতা কিংবা যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার মতো পরিস্থিতি তাঁর কাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেলে প্রকৃত মেধা আড়ালে থেকে যায়।

সাংবাদিকতার এই বাস্তবতা বোঝাতে আমরা রূপক অর্থে দুটি শ্রেণির কথা বলতে পারি। একদিকে রয়েছেন সেই সাংবাদিকেরা, যাঁরা কাজ, সততা ও পেশাগত দক্ষতাকে প্রধান বিবেচনা করেন। অন্যদিকে রয়েছেন এমন কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি, যাঁদের বিরুদ্ধে পেশাগত দায়িত্বের চেয়ে পদ-পদবি, প্রভাব বিস্তার ও ব্যক্তিগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই বিভাজন কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিন্যাস নয়; বরং সাংবাদিকতার নৈতিক সংকট বোঝার একটি রূপক।

সমস্যা হলো, কর্মদক্ষতা সব সময় সাংগঠনিক প্রভাব নিশ্চিত করে না। যাঁরা নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান, সম্পাদনা ও তথ্য যাচাইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাঁরা অনেক সময় নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। ফলে পেশাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাঁদের প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, যাঁরা সংগঠন পরিচালনা, যোগাযোগ রক্ষা ও নেতৃত্বের কাঠামোয় সক্রিয়, তাঁরা তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন।

প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক সংগঠন কিংবা গণমাধ্যমের বিভিন্ন পেশাজীবী প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এসব প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কোনো সংগঠন যদি ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, পদ ধরে রাখা কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে তার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সংগঠনের নেতৃত্বের মূল্যায়ন হওয়া উচিত কাজ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে।

গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ ও সম্পাদকের দায়িত্বও এখানে কম নয়। একটি সংবাদমাধ্যমের সাফল্য কেবল পর্দায় পরিচিত মুখের উপস্থিতি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার যোগাযোগ কতটা ঘনিষ্ঠ, তার ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে থাকে প্রতিবেদক, উপসম্পাদক, সংবাদ সম্পাদক, আলোকচিত্রী, ভিডিও সাংবাদিক এবং অসংখ্য কর্মীর সম্মিলিত শ্রম। যাঁরা মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন, ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ তৈরি করেন এবং নির্ভুলতার জন্য বারবার যাচাই করেন, তাঁদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন।

কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি তোষামোদ পেশাগত দক্ষতার বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে সঠিক মূল্যায়নের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে যোগ্য কর্মীরা নিরুৎসাহিত হন, নতুন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ কমে যায় এবং প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তাই সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্বে প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগ, কাজের ন্যায্য মূল্যায়ন, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা।

গণমাধ্যম শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট বিনিয়োগ ও বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়ে গেলে কিংবা ব্যবসায়িক ও পেশাগত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে নতুন উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা বা প্রতারণার অভিযোগ থাকলে সেগুলোর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া পুরো গণমাধ্যম শিল্পকে বিনিয়োগ-অনুপযোগী বা প্রতারণাপ্রবণ বলে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রথম শর্ত হলো, সৎ ও দক্ষ সাংবাদিকদের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠা। পেশাগত অধিকার, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে তাঁদের সম্মিলিত অবস্থান প্রয়োজন। তবে সেই ঐক্য যেন আরেকটি গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। উদ্দেশ্য হতে হবে কাউকে হেয় করা কিংবা ক্ষমতার পালাবদল ঘটানো নয়; বরং পেশাগত মান উন্নয়ন, নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা।

সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সদস্যদের দক্ষতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত অবদানের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সংবাদমাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকদের নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে মতপ্রকাশের সুযোগ থাকবে এবং কোনো কর্মীকে ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে বিচার করা হবে না। একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও নিজেদের কাজের জবাবদিহি মেনে নিতে হবে। ভুল সংবাদ প্রকাশিত হলে সংশোধন, অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই এবং স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা পেশাগত দায়িত্বের অংশ।

পাঠকেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিচিতি, জনপ্রিয়তা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় উপস্থিতির ভিত্তিতে কাউকে আদর্শ সাংবাদিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অসৎ বলাও ন্যায়সংগত নয়। সাংবাদিকতার মূল্যায়ন করতে হবে প্রকাশিত সংবাদ, তথ্যের নির্ভুলতা, নৈতিক অবস্থান এবং দায়িত্ব পালনের প্রমাণের ভিত্তিতে।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সাংবাদিকদের নিজেদের পেশার মর্যাদাও রক্ষা করতে হবে। পেশার ভেতরে অনিয়ম থাকলে তা আড়াল করা নয়, যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকাশ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের নিজেদের ক্ষেত্রেও একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। কারণ, নীতি কেবল অন্যকে উপদেশ দেওয়ার বিষয় নয়; তা নিজের আচরণে প্রতিষ্ঠা করারও বিষয়।

গণমাধ্যমের সংকট থেকে উত্তরণের পথ কোনো একক ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের হাতে নেই। প্রয়োজন পেশাগত সততা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, ন্যায্য মূল্যায়ন, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। সৎ সাংবাদিকেরা যদি নিজেদের কাজের পাশাপাশি পেশার বৃহত্তর স্বার্থেও সক্রিয় হন, আর সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্ব যদি যোগ্যতা ও সততাকে যথাযথ মর্যাদা দেয়, তবে পরিবর্তনের বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে।

শেষ পর্যন্ত একজন সাংবাদিকের পরিচয় তাঁর পোশাক, পদবি, বক্তব্য কিংবা সংগঠনের পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় তাঁর কাজ, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার সক্ষমতায়। সাংবাদিকতার অন্দরমহলে যে সংকটই থাকুক, তার সমাধান কাউকে অন্ধভাবে নায়ক কিংবা খলনায়ক বানানো নয়; বরং প্রমাণ, ন্যায় ও পেশাগত নৈতিকতার ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।