বাংলাদেশ 12:53 am, Sunday, 25 October 2026
[gtranslate]

পানির নিচে সোনালী স্বপ্ন: হাওরে কৃষকের কান্না

কিশোরগঞ্জ—বাংলাদেশের হাওরসমৃদ্ধ এই জনপদে বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সময় বোরো ধান কাটার মৌসুম। বিস্তীর্ণ জলাভূমি শুকিয়ে যখন সোনালী ধানে ভরে ওঠে মাঠ, তখনই শুরু হয় কৃষকের ঘরে ফসল তোলার উৎসব। কিন্তু এ বছরের সেই উৎসব যেন হঠাৎই থমকে গেছে টানা অতিবৃষ্টির কারণে। গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে হাওরের নিম্নাঞ্চলগুলোতে জমে থাকা পানি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে পাকা ধানক্ষেত। বিশেষ করে অষ্টগ্রাম উপজেলা-এর খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে খোয়াই নদী-এর পানি ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাঠের পর মাঠ সোনালী ধান এখন পানির নিচে ডুবে, যেন কৃষকের স্বপ্নগুলোও তলিয়ে যাচ্ছে। শুধু ক্ষেতেই নয়, বিপর্যয় নেমে এসেছে খলায়ও। যেখানে কাটা ধান শুকিয়ে সংরক্ষণের কথা, সেখানে জমে আছে বৃষ্টির পানি। ফলে মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ—সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কৃষকের ঘরে ধান ওঠার আগেই শুরু হয়েছে লোকসানের হিসাব।

নিকলী উপজেলা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিনও ছিল বৃষ্টি, আর সামনের দিনগুলোতেও রয়েছে একই পূর্বাভাস। অর্থাৎ, দুর্ভোগের শেষ এখনও দেখা যাচ্ছে না। এই দুর্যোগ শুধু একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। ইটনা উপজেলা, মিঠামইন উপজেলা, তাড়াইল উপজেলা, করিমগঞ্জ উপজেলা ও বাজিতপুর উপজেলা-এর হাওর এলাকাগুলোতেও পানি বাড়ছে। কোথাও কোথাও ধান কাটা বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ জমিতে পানি জমে থাকায় যন্ত্র নামানোই সম্ভব হচ্ছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যার বড় অংশই হাওরাঞ্চলে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক ধান কাটা সম্পন্ন হলেও, বাকি অংশ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। “শত শত একর ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। মেশিন নামাতে পারছি না। চোখের সামনে কষ্টের ফসল ডুবে যাচ্ছে, আমরা কিছুই করতে পারছি না।” প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে ফসল ফলানো এই কৃষকদের জন্য হাওর মানেই সম্ভাবনা, আবার কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত দুর্যোগের প্রতিচ্ছবি। এখন তাঁদের চোখ শুধু আকাশের দিকে—বৃষ্টি থামবে কি? পানি নামবে কি? নাকি সোনালী স্বপ্ন আরও গভীরে ডুবে যাবে?

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। তবে কৃষকেরা বলছেন, হিসাব নয়—এখন প্রয়োজন দ্রুত সহায়তা, যাতে অন্তত যা অবশিষ্ট আছে, তা রক্ষা করা যায়।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

মাদকের সর্বগ্রাসী বিস্তার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই

পানির নিচে সোনালী স্বপ্ন: হাওরে কৃষকের কান্না

প্রকাশ 01:28:09 pm, Tuesday, 28 April 2026

কিশোরগঞ্জ—বাংলাদেশের হাওরসমৃদ্ধ এই জনপদে বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সময় বোরো ধান কাটার মৌসুম। বিস্তীর্ণ জলাভূমি শুকিয়ে যখন সোনালী ধানে ভরে ওঠে মাঠ, তখনই শুরু হয় কৃষকের ঘরে ফসল তোলার উৎসব। কিন্তু এ বছরের সেই উৎসব যেন হঠাৎই থমকে গেছে টানা অতিবৃষ্টির কারণে। গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে হাওরের নিম্নাঞ্চলগুলোতে জমে থাকা পানি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে পাকা ধানক্ষেত। বিশেষ করে অষ্টগ্রাম উপজেলা-এর খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে খোয়াই নদী-এর পানি ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাঠের পর মাঠ সোনালী ধান এখন পানির নিচে ডুবে, যেন কৃষকের স্বপ্নগুলোও তলিয়ে যাচ্ছে। শুধু ক্ষেতেই নয়, বিপর্যয় নেমে এসেছে খলায়ও। যেখানে কাটা ধান শুকিয়ে সংরক্ষণের কথা, সেখানে জমে আছে বৃষ্টির পানি। ফলে মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ—সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কৃষকের ঘরে ধান ওঠার আগেই শুরু হয়েছে লোকসানের হিসাব।

নিকলী উপজেলা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিনও ছিল বৃষ্টি, আর সামনের দিনগুলোতেও রয়েছে একই পূর্বাভাস। অর্থাৎ, দুর্ভোগের শেষ এখনও দেখা যাচ্ছে না। এই দুর্যোগ শুধু একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। ইটনা উপজেলা, মিঠামইন উপজেলা, তাড়াইল উপজেলা, করিমগঞ্জ উপজেলা ও বাজিতপুর উপজেলা-এর হাওর এলাকাগুলোতেও পানি বাড়ছে। কোথাও কোথাও ধান কাটা বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ জমিতে পানি জমে থাকায় যন্ত্র নামানোই সম্ভব হচ্ছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যার বড় অংশই হাওরাঞ্চলে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক ধান কাটা সম্পন্ন হলেও, বাকি অংশ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। “শত শত একর ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। মেশিন নামাতে পারছি না। চোখের সামনে কষ্টের ফসল ডুবে যাচ্ছে, আমরা কিছুই করতে পারছি না।” প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে ফসল ফলানো এই কৃষকদের জন্য হাওর মানেই সম্ভাবনা, আবার কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত দুর্যোগের প্রতিচ্ছবি। এখন তাঁদের চোখ শুধু আকাশের দিকে—বৃষ্টি থামবে কি? পানি নামবে কি? নাকি সোনালী স্বপ্ন আরও গভীরে ডুবে যাবে?

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। তবে কৃষকেরা বলছেন, হিসাব নয়—এখন প্রয়োজন দ্রুত সহায়তা, যাতে অন্তত যা অবশিষ্ট আছে, তা রক্ষা করা যায়।