বাংলাদেশ 3:53 pm, Friday, 30 October 2026
জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে সম্পাদকীয়

যুবশক্তির জাগরণেই বদলাবে বাংলাদেশ

একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তারুণ্য মানে সম্ভাবনা, সাহস, সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। যে জাতি তারুণ্যকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে, সে জাতির অগ্রযাত্রা কেউ থামিয়ে রাখতে পারে না। বাংলাদেশের ইতিহাসও তার প্রমাণ। ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে তরুণেরাই রেখেছেন সাহসী ভূমিকা। তাই জাতীয় যুব দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের শক্তি, স্বপ্ন ও দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার উপলক্ষ।

আগামী ১ নভেম্বর দেশে উদযাপিত হতে যাচ্ছে জাতীয় যুব দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। দিবসটি উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ১৪ জন সফল যুব উদ্যোক্তা ও সংগঠককে জাতীয় যুব পুরস্কার দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। পাশাপাশি ৫৫টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে চাকরি মেলা, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন, যুব ঋণ বিতরণ, প্রশিক্ষণ, রক্তদান ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে যুবসমাজকে উৎপাদনশীল ও স্বাবলম্বী করে তোলার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থান ও দক্ষতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ কি তৈরি হচ্ছে? উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। শিক্ষিত বেকারত্ব, কর্মমুখী শিক্ষার ঘাটতি, দক্ষতার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্য এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ তরুণদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের অনেক তরুণ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও দিকনির্দেশনার অভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এগোতে পারছেন না। ফলে শুধু দিবস পালন কিংবা বক্তৃতায় যুব উন্নয়নের কথা বললে চলবে না; প্রয়োজন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

বর্তমান বিশ্বে কর্মসংস্থানের ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল বিপণন, কৃষি প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব শিল্প ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের তরুণদের এসব পরিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে হবে, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, প্রয়োজন দক্ষতানির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তোলা।

যুব উন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমানোও জরুরি। শহরের তরুণেরা যেখানে তুলনামূলকভাবে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক তরুণ এখনো মৌলিক ডিজিটাল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের তরুণদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অথচ মৎস্য, কৃষি, পশুপালন, পর্যটন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় এখানকার তরুণদের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন উপযোগী প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, বাজারসংযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা।

যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে ঋণ বিতরণের পাশাপাশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরামর্শ, বাজার বিশ্লেষণ ও ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা না থাকায় নতুন উদ্যোক্তারা ঝুঁকিতে পড়েন। তাই ঋণের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ যুক্ত করতে হবে। শুধু কতজনকে ঋণ দেওয়া হলো, সেই হিসাব নয়; কতজন সফল উদ্যোক্তা হলেন এবং কতটি টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মাপকাঠি।

তরুণদের দায়িত্বও কম নয়। অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিজেদের যোগ্যতা, সততা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটাতে হবে। মাদক, সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, গুজব ও অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে থেকে সমাজ পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। স্বেচ্ছাসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা, রক্তদান, সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের আরও সক্রিয় হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিকাশে এর ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, শিল্পোদ্যোক্তা ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে তরুণদের জন্য নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ তৈরি করা। মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন, বৈষম্যহীন সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের শুধু সভা-সমাবেশের অংশগ্রহণকারী কিংবা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

জাতীয় যুব দিবসে ১৪ জনকে পুরস্কৃত করা হবে—এটি অবশ্যই অনুপ্রেরণার বিষয়। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নীরব উদ্যোক্তা, স্বেচ্ছাসেবক, উদ্ভাবক ও সমাজকর্মীর অবদানও স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে। পুরস্কারের পরিসর আরও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম ইতিবাচক কাজে উৎসাহিত হয়।

তারুণ্য কোনো নির্দিষ্ট বয়সের পরিচয়মাত্র নয়; এটি স্বপ্ন দেখার, ঝুঁকি নেওয়ার এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার মানসিক শক্তি। বাংলাদেশের জনমিতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সময় এখনই। এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সম্পদ হওয়ার বদলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। তাই যুব দিবসের অঙ্গীকার যেন অনুষ্ঠান ও প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বাস্তব অগ্রগতি দিয়ে এর সাফল্য পরিমাপ করতে হবে।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো তরুণ বেকারত্বের হতাশায় সম্ভাবনা হারাবেন না; মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। যেখানে তরুণেরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, চাকরিদাতা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবেন। জাতীয় যুব দিবসে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা—তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগুক দেশ গড়ার কাজে, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ হোক অর্থনীতি, আর তরুণদের স্বপ্নের হাত ধরেই এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

‘তুমিই সেরা’, নিককে নিয়ে প্রিয়াঙ্কার আবেগঘন পোস্ট

জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে সম্পাদকীয়

যুবশক্তির জাগরণেই বদলাবে বাংলাদেশ

প্রকাশ 12:55:47 pm, Friday, 30 October 2026

একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তারুণ্য মানে সম্ভাবনা, সাহস, সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। যে জাতি তারুণ্যকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে, সে জাতির অগ্রযাত্রা কেউ থামিয়ে রাখতে পারে না। বাংলাদেশের ইতিহাসও তার প্রমাণ। ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে তরুণেরাই রেখেছেন সাহসী ভূমিকা। তাই জাতীয় যুব দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের শক্তি, স্বপ্ন ও দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার উপলক্ষ।

আগামী ১ নভেম্বর দেশে উদযাপিত হতে যাচ্ছে জাতীয় যুব দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। দিবসটি উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ১৪ জন সফল যুব উদ্যোক্তা ও সংগঠককে জাতীয় যুব পুরস্কার দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। পাশাপাশি ৫৫টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে চাকরি মেলা, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন, যুব ঋণ বিতরণ, প্রশিক্ষণ, রক্তদান ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে যুবসমাজকে উৎপাদনশীল ও স্বাবলম্বী করে তোলার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থান ও দক্ষতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ কি তৈরি হচ্ছে? উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। শিক্ষিত বেকারত্ব, কর্মমুখী শিক্ষার ঘাটতি, দক্ষতার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্য এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ তরুণদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের অনেক তরুণ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও দিকনির্দেশনার অভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এগোতে পারছেন না। ফলে শুধু দিবস পালন কিংবা বক্তৃতায় যুব উন্নয়নের কথা বললে চলবে না; প্রয়োজন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

বর্তমান বিশ্বে কর্মসংস্থানের ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল বিপণন, কৃষি প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব শিল্প ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের তরুণদের এসব পরিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে হবে, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, প্রয়োজন দক্ষতানির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তোলা।

যুব উন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমানোও জরুরি। শহরের তরুণেরা যেখানে তুলনামূলকভাবে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক তরুণ এখনো মৌলিক ডিজিটাল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের তরুণদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অথচ মৎস্য, কৃষি, পশুপালন, পর্যটন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় এখানকার তরুণদের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন উপযোগী প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, বাজারসংযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা।

যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে ঋণ বিতরণের পাশাপাশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরামর্শ, বাজার বিশ্লেষণ ও ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা না থাকায় নতুন উদ্যোক্তারা ঝুঁকিতে পড়েন। তাই ঋণের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ যুক্ত করতে হবে। শুধু কতজনকে ঋণ দেওয়া হলো, সেই হিসাব নয়; কতজন সফল উদ্যোক্তা হলেন এবং কতটি টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মাপকাঠি।

তরুণদের দায়িত্বও কম নয়। অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিজেদের যোগ্যতা, সততা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটাতে হবে। মাদক, সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, গুজব ও অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে থেকে সমাজ পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। স্বেচ্ছাসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা, রক্তদান, সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের আরও সক্রিয় হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিকাশে এর ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, শিল্পোদ্যোক্তা ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে তরুণদের জন্য নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ তৈরি করা। মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন, বৈষম্যহীন সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের শুধু সভা-সমাবেশের অংশগ্রহণকারী কিংবা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

জাতীয় যুব দিবসে ১৪ জনকে পুরস্কৃত করা হবে—এটি অবশ্যই অনুপ্রেরণার বিষয়। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নীরব উদ্যোক্তা, স্বেচ্ছাসেবক, উদ্ভাবক ও সমাজকর্মীর অবদানও স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে। পুরস্কারের পরিসর আরও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম ইতিবাচক কাজে উৎসাহিত হয়।

তারুণ্য কোনো নির্দিষ্ট বয়সের পরিচয়মাত্র নয়; এটি স্বপ্ন দেখার, ঝুঁকি নেওয়ার এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার মানসিক শক্তি। বাংলাদেশের জনমিতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সময় এখনই। এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সম্পদ হওয়ার বদলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। তাই যুব দিবসের অঙ্গীকার যেন অনুষ্ঠান ও প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বাস্তব অগ্রগতি দিয়ে এর সাফল্য পরিমাপ করতে হবে।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো তরুণ বেকারত্বের হতাশায় সম্ভাবনা হারাবেন না; মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। যেখানে তরুণেরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, চাকরিদাতা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবেন। জাতীয় যুব দিবসে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা—তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগুক দেশ গড়ার কাজে, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ হোক অর্থনীতি, আর তরুণদের স্বপ্নের হাত ধরেই এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।