Dhaka সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মবসন্ত্রাসকে রুখে দিতে হবে

সাহিত্যপাতা
  • প্রকাশের সময় ০৫:৪০:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৪১ বার দেখা হয়েছে

মবসন্ত্রাস বলতে বোঝায়—আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে একদল মানুষের সম্মিলিত সহিংস আচরণ। এটি কখনো ধর্মীয় গুজব, কখনো চুরি বা অপবাদের অভিযোগ, আবার কখনো রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সামাজিক বিদ্বেষকে কেন্দ্র করে ঘটে। মবের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এটি যুক্তি মানে না, সত্য যাচাই করে না এবং ভুল স্বীকার করে না। ফলে সন্দেহই হয়ে ওঠে রায়, আর বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব চলে যায় উত্তেজিত জনতার হাতে।

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্র বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়, বরং আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থায় নিহিত। এই তিনটি স্তম্ভ দুর্বল হয়ে পড়লে রাষ্ট্রের ভৌত কাঠামো অক্ষত থাকলেও ভেতরে ভেতরে অরাজকতা জন্ম নেয়। বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে মবসন্ত্রাস সমাজে উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার লাভ করছে।

মবসন্ত্রাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি বিপজ্জনক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যখন ব্যক্তি তার বিবেক, যুক্তি ও মানবিক দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে অন্ধভাবে ভিড়ের অংশ হয়ে যায়, তখন ন্যায়বিচারের জায়গা দখল করে নেয় প্রতিশোধস্পৃহা। একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে। কিন্তু মব কালচারে সে ন্যায্যতার কোনো স্থান থাকে না—থাকে কেবল গুজব, উত্তেজনা এবং সহিংসতা। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্দোষ মানুষ এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা।

গণপিটুনি, অজ্ঞাত পরিচয় লাশ উদ্ধার, রাজনৈতিক সহিংসতা—এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক চিত্র তুলে ধরে। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। নাগরিক তার জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তার বিনিময়ে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। এই সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব। তাই কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যায় না।

মবসন্ত্রাস প্রতিরোধে প্রথমত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও পেশাদার ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, গুজব নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি। দ্বিতীয়ত, মবসন্ত্রাসে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজে শক্ত বার্তা পৌঁছে যায় যে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তৃতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। গুজব যাচাই না করে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, জনতার হাতে নয়। তাই মবসন্ত্রাস প্রতিরোধ করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করেই আমরা একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে পারি।

সম্পর্কিত

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

মবসন্ত্রাসকে রুখে দিতে হবে

প্রকাশের সময় ০৫:৪০:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মবসন্ত্রাস বলতে বোঝায়—আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে একদল মানুষের সম্মিলিত সহিংস আচরণ। এটি কখনো ধর্মীয় গুজব, কখনো চুরি বা অপবাদের অভিযোগ, আবার কখনো রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সামাজিক বিদ্বেষকে কেন্দ্র করে ঘটে। মবের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এটি যুক্তি মানে না, সত্য যাচাই করে না এবং ভুল স্বীকার করে না। ফলে সন্দেহই হয়ে ওঠে রায়, আর বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব চলে যায় উত্তেজিত জনতার হাতে।

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্র বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়, বরং আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থায় নিহিত। এই তিনটি স্তম্ভ দুর্বল হয়ে পড়লে রাষ্ট্রের ভৌত কাঠামো অক্ষত থাকলেও ভেতরে ভেতরে অরাজকতা জন্ম নেয়। বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে মবসন্ত্রাস সমাজে উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার লাভ করছে।

মবসন্ত্রাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি বিপজ্জনক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যখন ব্যক্তি তার বিবেক, যুক্তি ও মানবিক দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে অন্ধভাবে ভিড়ের অংশ হয়ে যায়, তখন ন্যায়বিচারের জায়গা দখল করে নেয় প্রতিশোধস্পৃহা। একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে। কিন্তু মব কালচারে সে ন্যায্যতার কোনো স্থান থাকে না—থাকে কেবল গুজব, উত্তেজনা এবং সহিংসতা। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্দোষ মানুষ এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা।

গণপিটুনি, অজ্ঞাত পরিচয় লাশ উদ্ধার, রাজনৈতিক সহিংসতা—এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক চিত্র তুলে ধরে। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। নাগরিক তার জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তার বিনিময়ে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। এই সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব। তাই কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যায় না।

মবসন্ত্রাস প্রতিরোধে প্রথমত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও পেশাদার ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, গুজব নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি। দ্বিতীয়ত, মবসন্ত্রাসে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজে শক্ত বার্তা পৌঁছে যায় যে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তৃতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। গুজব যাচাই না করে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, জনতার হাতে নয়। তাই মবসন্ত্রাস প্রতিরোধ করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করেই আমরা একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে পারি।