বাংলাদেশ 3:34 pm, Monday, 26 October 2026
[gtranslate]

৩০ হাজার খাল চিহ্নিতের উদ্যোগ: দখলমুক্তিই হবে বড় চ্যালেঞ্জ

  • Reporter Name
  • প্রকাশ 05:05:59 am, Thursday, 5 March 2026
  • 196 Time View

নদীমাতৃক বাংলাদেশের জলব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাল। অথচ দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দেশের অসংখ্য খাল হারিয়ে যেতে বসেছে। এ বাস্তবতায় প্রায় ৩০ হাজার খাল চিহ্নিতকরণ, ম্যাপ তৈরি এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির জন্য ৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া সরকারের একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতার ওপর।

বাংলাদেশে নদী নিয়ে তুলনামূলকভাবে কিছু তথ্যভাণ্ডার থাকলেও খাল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো সমন্বিত ও হালনাগাদ ডাটাবেজ ছিল না। ফলে কোথায় কত খাল রয়েছে, কোন খাল দখল হয়েছে বা কোথায় খনন প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব ছিল। এর ফলে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে এবং খাল রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজও অনেক ক্ষেত্রে থমকে গেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রকল্পটি এই ঘাটতি পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

প্রকল্পের আওতায় দেশের খালগুলোকে চিহ্নিত করে বড়, মাঝারি ও ছোট—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। একই সঙ্গে জিও-ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে। এতে খালের অবস্থান, প্রবাহপথ ও পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা সম্পর্কে একটি সমন্বিত ধারণা পাওয়া যাবে। পরিকল্পিতভাবে খাল খনন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এমন একটি তথ্যভাণ্ডার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

তবে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তবতা হলো, দেশের অসংখ্য খাল অবৈধ দখল, বর্জ্য ফেলা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় খাল ভরাট করে বসতবাড়ি, বাজার কিংবা রাস্তা তৈরি হয়েছে। ফলে খাল চিহ্নিত হলেও যদি দখলমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে প্রকল্পের সুফল সীমিত হয়ে পড়বে।

সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের যে পরিকল্পনা করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে কৃষি, সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পানি নিষ্কাশনে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকাগুলোতে এর সুফল দ্রুত দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকলে নদী ও জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্যও কিছুটা পুনরুদ্ধার হবে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক সময় প্রকল্প নেওয়া হলেও তা টেকসইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। খননের কিছুদিন পরই আবার দখল বা ভরাট হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি খাল সংরক্ষণে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।

খাল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ শিরা–উপশিরা। এগুলো সচল থাকলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। তাই খাল চিহ্নিতকরণ প্রকল্পটি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

আইনের শাসন বনাম মব জাস্টিস টঙ্গীর মাদ্রাসার ঘটনা ও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা

৩০ হাজার খাল চিহ্নিতের উদ্যোগ: দখলমুক্তিই হবে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ 05:05:59 am, Thursday, 5 March 2026

নদীমাতৃক বাংলাদেশের জলব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাল। অথচ দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দেশের অসংখ্য খাল হারিয়ে যেতে বসেছে। এ বাস্তবতায় প্রায় ৩০ হাজার খাল চিহ্নিতকরণ, ম্যাপ তৈরি এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির জন্য ৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া সরকারের একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতার ওপর।

বাংলাদেশে নদী নিয়ে তুলনামূলকভাবে কিছু তথ্যভাণ্ডার থাকলেও খাল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো সমন্বিত ও হালনাগাদ ডাটাবেজ ছিল না। ফলে কোথায় কত খাল রয়েছে, কোন খাল দখল হয়েছে বা কোথায় খনন প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব ছিল। এর ফলে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে এবং খাল রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজও অনেক ক্ষেত্রে থমকে গেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রকল্পটি এই ঘাটতি পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

প্রকল্পের আওতায় দেশের খালগুলোকে চিহ্নিত করে বড়, মাঝারি ও ছোট—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। একই সঙ্গে জিও-ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে। এতে খালের অবস্থান, প্রবাহপথ ও পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা সম্পর্কে একটি সমন্বিত ধারণা পাওয়া যাবে। পরিকল্পিতভাবে খাল খনন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এমন একটি তথ্যভাণ্ডার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

তবে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তবতা হলো, দেশের অসংখ্য খাল অবৈধ দখল, বর্জ্য ফেলা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় খাল ভরাট করে বসতবাড়ি, বাজার কিংবা রাস্তা তৈরি হয়েছে। ফলে খাল চিহ্নিত হলেও যদি দখলমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে প্রকল্পের সুফল সীমিত হয়ে পড়বে।

সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের যে পরিকল্পনা করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে কৃষি, সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পানি নিষ্কাশনে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকাগুলোতে এর সুফল দ্রুত দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকলে নদী ও জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্যও কিছুটা পুনরুদ্ধার হবে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক সময় প্রকল্প নেওয়া হলেও তা টেকসইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। খননের কিছুদিন পরই আবার দখল বা ভরাট হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি খাল সংরক্ষণে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।

খাল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ শিরা–উপশিরা। এগুলো সচল থাকলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। তাই খাল চিহ্নিতকরণ প্রকল্পটি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।