বাংলাদেশ 4:34 pm, Saturday, 24 October 2026
[gtranslate]

জল, বন আর মানুষের গান: সাতক্ষীরার জীবনকথা

কিছু জনপদ আছে, যাদের পরিচয় দিতে মানচিত্র যথেষ্ট নয়। সেখানে যেতে হয় ভোরের কুয়াশা গায়ে মেখে, নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে, নৌকার গলুইয়ে বসে জোয়ারের শব্দ শুনে। সাতক্ষীরা তেমনই এক জনপদ। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে, যেখানে স্থল আস্তে আস্তে জলের কাছে নত হয়, যেখানে মাটির গন্ধে মিশে থাকে নোনা বাতাসের স্বাদ, সেখানেই এই জনপদের বাস। এখানকার সংস্কৃতি কোনো বইয়ের পাতা থেকে জন্ম নেয়নি। জন্ম নিয়েছে নদীর বাঁকে, বনের ছায়ায়, হাটের কোলাহলে আর মায়ের কণ্ঠের ঘুমপাড়ানি সুরে।

সাতক্ষীরার প্রথম পরিচয় তার নদী। কপোতাক্ষ, বেতনা, ইছামতী, কালিন্দী, রায়মঙ্গল, খোলপেটুয়া, এই নামগুলো উচ্চারণ করলেই যেন জলের কলতান কানে বাজে। নদী এখানে শুধু জলপথ নয়, নদী এখানে মা, নদী এখানে সাক্ষী। এই নদীর ঢেউয়ে ভেসে এসেছে কত রাজার গল্প, কত বণিকের পাল, কত শরণার্থীর দীর্ঘশ্বাস। পাশের যশোরের সাগরদাঁড়ির কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়েও ভুলতে পারেননি তাঁর কপোতাক্ষকে। প্রবাসের নিঃসঙ্গ রাতে তিনি সেই নদীকে ডেকে বলেছিলেন, সতত তোমার কথা ভাবি এ নিৰ্জনে। এই আকুতি কেবল এক কবির নয়, এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা নদীপ্রেমেরই প্রতিধ্বনি।

নদীর ওপারে, জলের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, যার একটি বড় অংশ এই জেলার শ্যামনগর উপজেলার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া আর গোলপাতার সবুজ ঘনত্বে এই বন যেন প্রকৃতির নিজের হাতে লেখা এক মহাকাব্য। জোয়ারে ডোবে, ভাটায় জাগে, আবার ডোবে, আবার জাগে। এই চিরচঞ্চল ছন্দের ভেতরেই বাস করে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির আর অসংখ্য পাখির দল। আর বাস করে মানুষ, সাহসী, সরল, নিয়তির সঙ্গে প্রতিদিন চোখে চোখ রেখে বেঁচে থাকা মানুষ।

এই মানুষদের নাম মৌয়াল, বাওয়ালী, জেলে আর গোলপাতা সংগ্রাহক। বসন্তের দিনে যখন সুন্দরবনের গাছে গাছে ফুল ফোটে, তখন মৌয়ালরা নৌকা ভাসায় গহিন বনের দিকে। তাদের সঙ্গে থাকে না কোনো যন্ত্র, থাকে শুধু অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাস। বনে ঢোকার আগে তারা মাথা নত করে স্মরণ করে বনবিবিকে। এই বনবিবি সাতক্ষীরা ও সুন্দরবন অঞ্চলের লোকবিশ্বাসের এক অপূর্ব চরিত্র, যিনি হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের কাছেই সমান শ্রদ্ধার। বাঘের ভয়ে ভীত মানুষ তাঁর কাছে আশ্রয় চায়, আর তিনি মায়ের স্নেহে সবাইকে কোলে টেনে নেন। বনবিবির পালাগান, যার মূল আখ্যান ধরা আছে জহুরানামা ও লোকপুঁথিতে, এখানে কেবল বিনোদন নয়, এ যেন বনজীবনের ধর্মগ্রন্থ। দক্ষিণ রায় আর বনবিবির লড়াইয়ের কাহিনিতে আমরা দেখি অরণ্যের হিংস্রতা আর মানবিক করুণার চিরন্তন দ্বন্দ্ব, যেখানে শেষ জয় হয় মমতার। এমন সম্প্রীতির গল্প পৃথিবীর খুব কম জনপদেই এত সহজ সুরে বেঁচে আছে।

এই জনপদের ইতিহাসের পাতা উল্টালে চোখে পড়ে যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের কথা। শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত এই মন্দির পুরাণ অনুযায়ী একান্ন শক্তিপীঠের একটি বলে লোকমানসে পরিচিত। এই ঈশ্বরীপুরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বারো ভুঁইয়ার অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর রাজ্যের রাজধানী। মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিরোধের কাহিনি আজও এই অঞ্চলের লোকস্মৃতিতে উজ্জ্বল। ইতিহাসবিদরা তাঁর মূল্যায়ন নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এক স্বাধীনচেতা সাহসের প্রতীক। ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের ইটে, দীর্ঘ দিঘির জলে আর বটবৃক্ষের শিকড়ে আজও যেন সেই অতীতের নিঃশ্বাস লেগে আছে।

সাতক্ষীরা নামের উৎস নিয়েও রয়েছে নানা প্রচলিত কথা। কেউ বলেন সাতটি ঘরের বসতি থেকে এর নাম, কেউ বলেন অন্য কোনো লোককথার সূত্রে। ইতিহাসের নিখুঁত প্রমাণ হয়তো সবসময় মেলে না, কিন্তু এই কথাগুলোই প্রমাণ করে যে জনপদটির নিজের একটি স্মৃতি আছে, একটি আত্মপরিচয়ের তৃষ্ণা আছে। লোকমুখে ফেরা এই কাহিনিগুলোকে আমরা সত্য বা মিথ্যার কাঠগড়ায় না তুলে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই সম্মান করতে পারি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই সীমান্তঘেঁষা জনপদ হয়ে উঠেছিল এক অনন্য অধ্যায়। এক দিকে ভারতের সীমান্ত, অন্য দিকে নদী আর জঙ্গলের আড়াল। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা একাত্তরে একই সঙ্গে হয়েছে বিপদ আর আশ্রয়। কত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে এই পথেই পাড়ি দিয়েছে অজানার দিকে, কত তরুণ কাঁধে অস্ত্র তুলে ফিরে এসেছে এই মাটির ঋণ শোধ করতে। আজও কোনো প্রবীণ মানুষের কণ্ঠে সেই দিনের গল্প শুনলে বোঝা যায়, এ মাটির প্রতিটি ধুলিকণা রক্ত আর স্বপ্নে ভেজা।

সাহিত্যের আঙিনায়ও এই অঞ্চলের ছায়া দীর্ঘ। কপোতাক্ষ থেকে ইছামতী, এই নদীর নাম বাংলা সাহিত্যের পাতায় বারবার ফিরে এসেছে। জলে ভাসা এই জীবনের ছবি এঁকেছেন কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সবাই। এখানকার মাটির লেখকেরা আজও কলম হাতে বসেন ছোট ছোট সাহিত্যসভায়, স্থানীয় পত্রিকার পাতায়, তরুণদের নতুন আড্ডায়। তাঁদের লেখায় ধরা পড়ে লবণাক্ততার কষ্ট, জলোচ্ছ্বাসের ভয়, আবার বসন্তের প্রথম আমের মুকুলের গন্ধও। এই সাহিত্য জাঁকজমকের নয়, মাটির কাছাকাছি, সত্যের কাছাকাছি।

লোকজ সংস্কৃতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে গান। এখানকার আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায় কবিগান, জারিগান, পালাগান, ভাটিয়ালি, বাউল আর মনসামঙ্গলের সুর। শীতের রাতে গ্রামের উঠানে জ্বলে ওঠে হ্যারিকেনের আলো, মাদুরে বসে থাকে মানুষের ভিড়, আর পালাকারের কণ্ঠে জেগে ওঠে পুরোনো দিনের নায়ক নায়িকা। জাত ধর্মের দেয়াল সেখানে ঝরে পড়ে, থাকে শুধু গল্পের টান আর সুরের মায়া। যাত্রাপালার মঞ্চেও একসময় এই জনপদ ছিল সরব, যদিও আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই সোনালি দিন এখন কিছুটা ম্লান।

খাদ্যসংস্কৃতিতেও সাতক্ষীরা নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে। নদী আর মোহনার এই জনপদে চিংড়ি, কাঁকড়া আর নানা মাছের স্বাদ যেন রান্নাঘরের আলাদা এক ভাষা। শীত এলে খেজুরের রস আর ভাপা পিঠা, চিতই আর পুলির সৌরভে ভরে যায় প্রতিটি উঠান। নারকেল, গুড়, চালের গুঁড়ো, সামান্য এই উপকরণে তৈরি পিঠাগুলো আসলে ভালোবাসারই আরেক রূপ। মেহমান এলে এখানে শুধু খাবার সাজানো হয় না, সাজানো হয় আন্তরিকতা। এই অতিথিপরায়ণতাই সাতক্ষীরার মানুষের সবচেয়ে বড় অলংকার।

ঘরবাড়ির গড়নেও রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মিতালির ছাপ। গোলপাতার ছাউনি, মাটির দেয়াল, বাঁশের খুঁটি, উঠান ঘিরে সুপারি আর নারকেলের সারি। নকশিকাঁথার সুতোয় গাঁথা হয় নারীদের না বলা কথা, পাটির বুননে বোনা হয় ধৈর্য আর শিল্পবোধ। এই হস্তশিল্পগুলো শুধু ব্যবহারের জিনিস নয়, এরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা স্মৃতির বাহক।

কিন্তু এই সৌন্দর্যের পাশেই লেগে আছে এক গভীর বেদনা। সিডর, আইলা, আম্ফান, বুলবুল, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় এই জনপদের বুকে রেখে গেছে ক্ষত। বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকেছে ঘরে, ফসলের মাঠ হয়েছে লবণাক্ত, মিষ্টি পানির জন্য মেয়েদের হাঁটতে হয়েছে মাইলের পর মাইল। জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতা এখানে কোনো সেমিনারের বিষয় নয়, এ প্রতিদিনের জীবনের লড়াই। তবু আশ্চর্য, এই মানুষগুলো ভেঙে পড়ে না। ঘর ভাঙলে আবার ঘর বাঁধে, বাঁধ ভাঙলে আবার মাটি তোলে, চিংড়ির ঘের ডুবলে আবার নতুন করে স্বপ্ন বোনে। এই অদম্য জীবনীশক্তিই সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সংস্কৃতি।

এখানে আমাদের মতো শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বও কম নয়। পর্যটন ও আতিথেয়তা শিক্ষার একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সুন্দরবন আর তার চারপাশের এই জনপদ হতে পারে টেকসই ও দায়িত্বশীল পর্যটনের আদর্শ উদাহরণ। কিন্তু সে পর্যটন হতে হবে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল, স্থানীয় মানুষের জন্য লাভজনক, আর সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল। পর্যটক যেন এখানে শুধু ছবি তুলে না ফেরে, ফিরে যায় বনবিবির গল্প, মৌয়ালের সাহস আর পিঠার উষ্ণতা বুকে নিয়ে। স্থানীয় তরুণেরা যেন নিজের মাটির গাইড, কারিগর আর গল্পকার হয়ে উঠতে পারে, সেই পথ তৈরি করাই আমাদের কাজ।

আজকের বিশ্বায়নের যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় ভয়, নিজের শিকড় ভুলে যাওয়ার ভয়। শহরের আলো তরুণদের টানছে, মোবাইলের পর্দায় হারিয়ে যাচ্ছে পালাগানের আসর, দাদির মুখের গল্প এখন শোনার মানুষ কম। অথচ একটি জাতির আসল সম্পদ তার স্মৃতি। যে জনপদ নিজের গান ভোলে, সে নিজের ঠিকানাও হারায়। তাই প্রয়োজন লোকশিল্পীদের সম্মান, পালাগানের লিখিত ও ডিজিটাল সংরক্ষণ, স্কুল কলেজে স্থানীয় ইতিহাস ও সাহিত্যচর্চা, আর সবার ওপরে প্রয়োজন নিজের মাটিকে ভালোবাসার শিক্ষা।

সাতক্ষীরা তাই কেবল একটি জেলার নাম নয়। সে এক জীবন্ত গল্প, যার প্রথম পাতায় নদী, মাঝের পাতায় বন, আর শেষ পাতায় মানুষ। এই গল্পে আছে রাজার গর্ব, কবির আকুতি, মৌয়ালের সাহস, মায়ের আঁচল আর শিশুর হাসি। সন্ধ্যায় যখন কপোতাক্ষের জলে লাল সূর্য ডুবে যায়, দূরের গ্রাম থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি আর শঙ্খের আওয়াজ, তখন মনে হয়, এই তো আমার বাংলাদেশ, বৈচিত্র্যে ভরা অথচ হৃদয়ে এক।

আসুন, আমরা এই জনপদের গানকে বাঁচিয়ে রাখি, তার নদীকে বাঁচাই, তার বনকে রক্ষা করি, আর তার মানুষের পাশে দাঁড়াই। কারণ সংস্কৃতি টিকে থাকে মানুষের ভালোবাসায়, আর ভালোবাসা শুরু হয় নিজের মাটিকে চেনা থেকে।

মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

যশোর-বেনাপোল সড়কে দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ৩

জল, বন আর মানুষের গান: সাতক্ষীরার জীবনকথা

প্রকাশ 02:09:59 pm, Friday, 23 October 2026

কিছু জনপদ আছে, যাদের পরিচয় দিতে মানচিত্র যথেষ্ট নয়। সেখানে যেতে হয় ভোরের কুয়াশা গায়ে মেখে, নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে, নৌকার গলুইয়ে বসে জোয়ারের শব্দ শুনে। সাতক্ষীরা তেমনই এক জনপদ। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে, যেখানে স্থল আস্তে আস্তে জলের কাছে নত হয়, যেখানে মাটির গন্ধে মিশে থাকে নোনা বাতাসের স্বাদ, সেখানেই এই জনপদের বাস। এখানকার সংস্কৃতি কোনো বইয়ের পাতা থেকে জন্ম নেয়নি। জন্ম নিয়েছে নদীর বাঁকে, বনের ছায়ায়, হাটের কোলাহলে আর মায়ের কণ্ঠের ঘুমপাড়ানি সুরে।

সাতক্ষীরার প্রথম পরিচয় তার নদী। কপোতাক্ষ, বেতনা, ইছামতী, কালিন্দী, রায়মঙ্গল, খোলপেটুয়া, এই নামগুলো উচ্চারণ করলেই যেন জলের কলতান কানে বাজে। নদী এখানে শুধু জলপথ নয়, নদী এখানে মা, নদী এখানে সাক্ষী। এই নদীর ঢেউয়ে ভেসে এসেছে কত রাজার গল্প, কত বণিকের পাল, কত শরণার্থীর দীর্ঘশ্বাস। পাশের যশোরের সাগরদাঁড়ির কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়েও ভুলতে পারেননি তাঁর কপোতাক্ষকে। প্রবাসের নিঃসঙ্গ রাতে তিনি সেই নদীকে ডেকে বলেছিলেন, সতত তোমার কথা ভাবি এ নিৰ্জনে। এই আকুতি কেবল এক কবির নয়, এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা নদীপ্রেমেরই প্রতিধ্বনি।

নদীর ওপারে, জলের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, যার একটি বড় অংশ এই জেলার শ্যামনগর উপজেলার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া আর গোলপাতার সবুজ ঘনত্বে এই বন যেন প্রকৃতির নিজের হাতে লেখা এক মহাকাব্য। জোয়ারে ডোবে, ভাটায় জাগে, আবার ডোবে, আবার জাগে। এই চিরচঞ্চল ছন্দের ভেতরেই বাস করে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির আর অসংখ্য পাখির দল। আর বাস করে মানুষ, সাহসী, সরল, নিয়তির সঙ্গে প্রতিদিন চোখে চোখ রেখে বেঁচে থাকা মানুষ।

এই মানুষদের নাম মৌয়াল, বাওয়ালী, জেলে আর গোলপাতা সংগ্রাহক। বসন্তের দিনে যখন সুন্দরবনের গাছে গাছে ফুল ফোটে, তখন মৌয়ালরা নৌকা ভাসায় গহিন বনের দিকে। তাদের সঙ্গে থাকে না কোনো যন্ত্র, থাকে শুধু অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাস। বনে ঢোকার আগে তারা মাথা নত করে স্মরণ করে বনবিবিকে। এই বনবিবি সাতক্ষীরা ও সুন্দরবন অঞ্চলের লোকবিশ্বাসের এক অপূর্ব চরিত্র, যিনি হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের কাছেই সমান শ্রদ্ধার। বাঘের ভয়ে ভীত মানুষ তাঁর কাছে আশ্রয় চায়, আর তিনি মায়ের স্নেহে সবাইকে কোলে টেনে নেন। বনবিবির পালাগান, যার মূল আখ্যান ধরা আছে জহুরানামা ও লোকপুঁথিতে, এখানে কেবল বিনোদন নয়, এ যেন বনজীবনের ধর্মগ্রন্থ। দক্ষিণ রায় আর বনবিবির লড়াইয়ের কাহিনিতে আমরা দেখি অরণ্যের হিংস্রতা আর মানবিক করুণার চিরন্তন দ্বন্দ্ব, যেখানে শেষ জয় হয় মমতার। এমন সম্প্রীতির গল্প পৃথিবীর খুব কম জনপদেই এত সহজ সুরে বেঁচে আছে।

এই জনপদের ইতিহাসের পাতা উল্টালে চোখে পড়ে যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের কথা। শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত এই মন্দির পুরাণ অনুযায়ী একান্ন শক্তিপীঠের একটি বলে লোকমানসে পরিচিত। এই ঈশ্বরীপুরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বারো ভুঁইয়ার অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর রাজ্যের রাজধানী। মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিরোধের কাহিনি আজও এই অঞ্চলের লোকস্মৃতিতে উজ্জ্বল। ইতিহাসবিদরা তাঁর মূল্যায়ন নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এক স্বাধীনচেতা সাহসের প্রতীক। ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের ইটে, দীর্ঘ দিঘির জলে আর বটবৃক্ষের শিকড়ে আজও যেন সেই অতীতের নিঃশ্বাস লেগে আছে।

সাতক্ষীরা নামের উৎস নিয়েও রয়েছে নানা প্রচলিত কথা। কেউ বলেন সাতটি ঘরের বসতি থেকে এর নাম, কেউ বলেন অন্য কোনো লোককথার সূত্রে। ইতিহাসের নিখুঁত প্রমাণ হয়তো সবসময় মেলে না, কিন্তু এই কথাগুলোই প্রমাণ করে যে জনপদটির নিজের একটি স্মৃতি আছে, একটি আত্মপরিচয়ের তৃষ্ণা আছে। লোকমুখে ফেরা এই কাহিনিগুলোকে আমরা সত্য বা মিথ্যার কাঠগড়ায় না তুলে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই সম্মান করতে পারি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই সীমান্তঘেঁষা জনপদ হয়ে উঠেছিল এক অনন্য অধ্যায়। এক দিকে ভারতের সীমান্ত, অন্য দিকে নদী আর জঙ্গলের আড়াল। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা একাত্তরে একই সঙ্গে হয়েছে বিপদ আর আশ্রয়। কত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে এই পথেই পাড়ি দিয়েছে অজানার দিকে, কত তরুণ কাঁধে অস্ত্র তুলে ফিরে এসেছে এই মাটির ঋণ শোধ করতে। আজও কোনো প্রবীণ মানুষের কণ্ঠে সেই দিনের গল্প শুনলে বোঝা যায়, এ মাটির প্রতিটি ধুলিকণা রক্ত আর স্বপ্নে ভেজা।

সাহিত্যের আঙিনায়ও এই অঞ্চলের ছায়া দীর্ঘ। কপোতাক্ষ থেকে ইছামতী, এই নদীর নাম বাংলা সাহিত্যের পাতায় বারবার ফিরে এসেছে। জলে ভাসা এই জীবনের ছবি এঁকেছেন কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সবাই। এখানকার মাটির লেখকেরা আজও কলম হাতে বসেন ছোট ছোট সাহিত্যসভায়, স্থানীয় পত্রিকার পাতায়, তরুণদের নতুন আড্ডায়। তাঁদের লেখায় ধরা পড়ে লবণাক্ততার কষ্ট, জলোচ্ছ্বাসের ভয়, আবার বসন্তের প্রথম আমের মুকুলের গন্ধও। এই সাহিত্য জাঁকজমকের নয়, মাটির কাছাকাছি, সত্যের কাছাকাছি।

লোকজ সংস্কৃতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে গান। এখানকার আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায় কবিগান, জারিগান, পালাগান, ভাটিয়ালি, বাউল আর মনসামঙ্গলের সুর। শীতের রাতে গ্রামের উঠানে জ্বলে ওঠে হ্যারিকেনের আলো, মাদুরে বসে থাকে মানুষের ভিড়, আর পালাকারের কণ্ঠে জেগে ওঠে পুরোনো দিনের নায়ক নায়িকা। জাত ধর্মের দেয়াল সেখানে ঝরে পড়ে, থাকে শুধু গল্পের টান আর সুরের মায়া। যাত্রাপালার মঞ্চেও একসময় এই জনপদ ছিল সরব, যদিও আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই সোনালি দিন এখন কিছুটা ম্লান।

খাদ্যসংস্কৃতিতেও সাতক্ষীরা নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে। নদী আর মোহনার এই জনপদে চিংড়ি, কাঁকড়া আর নানা মাছের স্বাদ যেন রান্নাঘরের আলাদা এক ভাষা। শীত এলে খেজুরের রস আর ভাপা পিঠা, চিতই আর পুলির সৌরভে ভরে যায় প্রতিটি উঠান। নারকেল, গুড়, চালের গুঁড়ো, সামান্য এই উপকরণে তৈরি পিঠাগুলো আসলে ভালোবাসারই আরেক রূপ। মেহমান এলে এখানে শুধু খাবার সাজানো হয় না, সাজানো হয় আন্তরিকতা। এই অতিথিপরায়ণতাই সাতক্ষীরার মানুষের সবচেয়ে বড় অলংকার।

ঘরবাড়ির গড়নেও রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মিতালির ছাপ। গোলপাতার ছাউনি, মাটির দেয়াল, বাঁশের খুঁটি, উঠান ঘিরে সুপারি আর নারকেলের সারি। নকশিকাঁথার সুতোয় গাঁথা হয় নারীদের না বলা কথা, পাটির বুননে বোনা হয় ধৈর্য আর শিল্পবোধ। এই হস্তশিল্পগুলো শুধু ব্যবহারের জিনিস নয়, এরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা স্মৃতির বাহক।

কিন্তু এই সৌন্দর্যের পাশেই লেগে আছে এক গভীর বেদনা। সিডর, আইলা, আম্ফান, বুলবুল, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় এই জনপদের বুকে রেখে গেছে ক্ষত। বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকেছে ঘরে, ফসলের মাঠ হয়েছে লবণাক্ত, মিষ্টি পানির জন্য মেয়েদের হাঁটতে হয়েছে মাইলের পর মাইল। জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতা এখানে কোনো সেমিনারের বিষয় নয়, এ প্রতিদিনের জীবনের লড়াই। তবু আশ্চর্য, এই মানুষগুলো ভেঙে পড়ে না। ঘর ভাঙলে আবার ঘর বাঁধে, বাঁধ ভাঙলে আবার মাটি তোলে, চিংড়ির ঘের ডুবলে আবার নতুন করে স্বপ্ন বোনে। এই অদম্য জীবনীশক্তিই সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সংস্কৃতি।

এখানে আমাদের মতো শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বও কম নয়। পর্যটন ও আতিথেয়তা শিক্ষার একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সুন্দরবন আর তার চারপাশের এই জনপদ হতে পারে টেকসই ও দায়িত্বশীল পর্যটনের আদর্শ উদাহরণ। কিন্তু সে পর্যটন হতে হবে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল, স্থানীয় মানুষের জন্য লাভজনক, আর সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল। পর্যটক যেন এখানে শুধু ছবি তুলে না ফেরে, ফিরে যায় বনবিবির গল্প, মৌয়ালের সাহস আর পিঠার উষ্ণতা বুকে নিয়ে। স্থানীয় তরুণেরা যেন নিজের মাটির গাইড, কারিগর আর গল্পকার হয়ে উঠতে পারে, সেই পথ তৈরি করাই আমাদের কাজ।

আজকের বিশ্বায়নের যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় ভয়, নিজের শিকড় ভুলে যাওয়ার ভয়। শহরের আলো তরুণদের টানছে, মোবাইলের পর্দায় হারিয়ে যাচ্ছে পালাগানের আসর, দাদির মুখের গল্প এখন শোনার মানুষ কম। অথচ একটি জাতির আসল সম্পদ তার স্মৃতি। যে জনপদ নিজের গান ভোলে, সে নিজের ঠিকানাও হারায়। তাই প্রয়োজন লোকশিল্পীদের সম্মান, পালাগানের লিখিত ও ডিজিটাল সংরক্ষণ, স্কুল কলেজে স্থানীয় ইতিহাস ও সাহিত্যচর্চা, আর সবার ওপরে প্রয়োজন নিজের মাটিকে ভালোবাসার শিক্ষা।

সাতক্ষীরা তাই কেবল একটি জেলার নাম নয়। সে এক জীবন্ত গল্প, যার প্রথম পাতায় নদী, মাঝের পাতায় বন, আর শেষ পাতায় মানুষ। এই গল্পে আছে রাজার গর্ব, কবির আকুতি, মৌয়ালের সাহস, মায়ের আঁচল আর শিশুর হাসি। সন্ধ্যায় যখন কপোতাক্ষের জলে লাল সূর্য ডুবে যায়, দূরের গ্রাম থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি আর শঙ্খের আওয়াজ, তখন মনে হয়, এই তো আমার বাংলাদেশ, বৈচিত্র্যে ভরা অথচ হৃদয়ে এক।

আসুন, আমরা এই জনপদের গানকে বাঁচিয়ে রাখি, তার নদীকে বাঁচাই, তার বনকে রক্ষা করি, আর তার মানুষের পাশে দাঁড়াই। কারণ সংস্কৃতি টিকে থাকে মানুষের ভালোবাসায়, আর ভালোবাসা শুরু হয় নিজের মাটিকে চেনা থেকে।

মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।