দিল্লির আমন্ত্রণ, ঢাকার মর্যাদা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন
- প্রকাশের সময় ০১:১০:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
- / ৪ বার দেখা হয়েছে
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের আগ্রহ অস্বাভাবিক নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ সীমান্ত, অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাসহ নানা কারণে দুই দেশের সম্পর্ক পরস্পরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রশ্নে শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং মানবাধিকারের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
সম্প্রতি ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নেওয়ার আগ্রহের বিষয়টি সামনে এসেছে। সফর এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে দিল্লির তৎপরতা এবং আগাম প্রস্তুতির তথ্য থেকে বোঝা যায়, ভারত বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত একটি কার্যকর সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চাইছে।
এটি ভারতের স্বার্থের দিক থেকে বোধগম্য। বাংলাদেশ ভারতের জন্য কেবল প্রতিবেশী একটি দেশ নয়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক যোগাযোগ রয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গত দেড় দশকে দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সম্পর্কের ভিত্তি কী হবে?
শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ ছিল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সহযোগিতাকেন্দ্রিক। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার নিয়ে নানা অভিযোগও উঠেছিল। ভারতের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে দেশের ভেতরে একধরনের অসন্তোষও তৈরি হয়েছিল। মানবাধিকারের প্রশ্নটি তাই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মনে রাখা দরকার, তা হলো—কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে সেই দেশের সরকারের সব কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা নয়। বরং প্রকৃত বন্ধুত্বের অর্থ হচ্ছে প্রয়োজনের সময় সত্য কথা বলা, ভুলের সমালোচনা করা এবং জনগণের অধিকার ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও দুই দেশের সম্পর্কের একটি জটিল বিষয়। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছে। বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও সাজা হয়েছে। অন্যদিকে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এই পুরো বিষয়টি এখন আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোনো উচিত।
ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোনো সাবেক সরকারপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়া এক বিষয়; কিন্তু সেই দেশ থেকে তিনি যদি বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সক্রিয় রাজনৈতিক বক্তব্য দেন, তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলে।
এখানে ভারতের জন্যও একটি বার্তা আছে—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্মান করা জরুরি। একইভাবে বাংলাদেশের জন্যও বার্তা আছে—পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে সেটিকে তাই কেবল সৌজন্য সফর হিসেবে দেখলে চলবে না। এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কিন্তু সেই নতুন অধ্যায় কেমন হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, কিন্তু কোনোভাবেই অসম সম্পর্ক মেনে না নেওয়া। সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্য ভারসাম্য, পানির ন্যায্য হিস্যা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, ভিসা, পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ—এসব বিষয়ে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে আলোচনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ভারতেরও বোঝা দরকার, বাংলাদেশের জনগণ এখন নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে আরও সচেতন। বাংলাদেশের মানুষ এমন কোনো সম্পর্ক চায় না, যেখানে একটি দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করবে। তারা চায় সম্মানজনক প্রতিবেশী সম্পর্ক—যেখানে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস থাকবে না।
বাংলাদেশের পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো নিয়েও একই নীতি প্রযোজ্য। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না। আবার অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর অর্থও ভারতের বিরোধিতা করা নয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হওয়া উচিত—বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, কিন্তু সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একই ধরনের সতর্কতা। কোনো সামরিক জোট বা নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার আগে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে গিয়ে অন্য একটি দেশের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ তৈরি করা বাংলাদেশের স্বার্থে নয়।
দিল্লির জন্য এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানো। সেই ভিত্তি হতে পারে জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র, পারস্পরিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সার্বভৌম সমতার প্রতি সম্মান। আর ঢাকার জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে না অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়া, না অকারণে বৈরিতা তৈরি করা। প্রতিবেশী বদলানো যায় না। কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বদলানো যায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
তারেক রহমান দিল্লি গেলে সেটি যেন কেবল লালগালিচা, আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও সৌজন্য বিনিময়ের সফর না হয়। সেখানে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা, মানবাধিকারের প্রশ্ন, সীমান্তে নিরাপত্তা, পানি, বাণিজ্য ও সমতার বিষয়গুলোও স্পষ্টভাবে আলোচিত হওয়া দরকার। কারণ রাষ্ট্রের বন্ধুত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের অধিকার। আর টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো—পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং আস্থা।



























