Dhaka 11:49 am, Friday, 23 October 2026
[gtranslate]
আট মাসে সরকারের পরীক্ষা

জনস্বস্তি ও সুশাসনই হোক সাফল্যের মাপকাঠি

মন্ত্রিসভায় পদত্যাগ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ এবং নিত্যপণ্যের চাপে সরকারের সামনে এখন জনআস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ

একটি নির্বাচিত সরকারের সাফল্য শুধু নির্বাচনে পাওয়া আসনসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। জনগণের দৈনন্দিন জীবনে কতটা স্বস্তি ফিরেছে, আইনের শাসন কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে—এসবই সরকারের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের আট মাস পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাই প্রশ্ন উঠছে, মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কতটা এগিয়েছে? সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিসভা থেকে কয়েকজনের বিদায়, মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক, দ্রব্যমূল্যের চাপ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে সরকারের সামনে জনআস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে আট মাসের মূল্যায়ন করতে হলে বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে সরকারের নীতি, কার্যক্রম ও বাস্তব ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে।

সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভা থেকে জহির উদ্দিন স্বপন, দীপেন দেওয়ান ও ইশরাক হোসেনের বিদায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। তাঁদের বিদায়ের প্রেক্ষাপট অবশ্য এক নয়। ইশরাক হোসেন মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে উপস্থিত হওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার মুখে ১৯ অক্টোবর ২০২৬ প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন। পরদিন তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এর আগে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন স্বপন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানও মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান।

ইশরাকের ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মাদক নির্মূল নিঃসন্দেহে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিও আইনসম্মত হতে হবে। একজন জনপ্রতিনিধি কিংবা মন্ত্রী অপরাধ দমনে উদ্যোগী হতে পারেন, প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সক্রিয় করার দাবি জানাতে পারেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার দৃশ্য জনমনে ভীতি তৈরি করতে পারে এবং আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছিল।

এখানে মূল প্রশ্ন শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ নয়; বরং রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কার, জনপ্রতিনিধির ক্ষমতার সীমা কোথায় এবং অভিযোগ উঠলে তার নিষ্পত্তি কীভাবে হবে। জনরোষের মুখে কাউকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না তার নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা—সবকিছুই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হওয়া দরকার। একইভাবে, মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের বিদায়ের কারণ ও প্রেক্ষাপটও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। সরকার চাইলে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করতে পারে, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি অস্পষ্ট থাকলে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের সাফল্য অনেক সময় খুব সরল কয়েকটি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যাচ্ছে কি না, মাসের আয় দিয়ে সংসার চলছে কি না, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক কি না এবং পরিবার নিয়ে নিরাপদে থাকা যাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও পণ্যের দাম আগের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। তাই শুধু মূল্যস্ফীতির একটি পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের দুর্ভোগের পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম, পরিবারের আয় এবং ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সরকারের দায়িত্ব বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি, কারসাজি কিংবা প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। বাজারে নিয়মিত অভিযান চালানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ফলাফল—পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে কি না, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কমেছে কি না এবং সাধারণ মানুষ বাস্তবে উপকৃত হচ্ছে কি না।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আবাসিক গ্রাহকের ভোগান্তির পাশাপাশি উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ে। সমস্যা কোথায়—উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ, অবকাঠামো, নাকি ব্যবস্থাপনায়—তা চিহ্নিত করে সরকারকে সময়বদ্ধ পরিকল্পনা নিতে হবে। পরিকল্পনা ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরাও প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা কিংবা অন্যান্য অপরাধের ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা জনআস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অপরাধ পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। অপরাধের ধরন, সময়ভিত্তিক তুলনামূলক পরিসংখ্যান, মামলা নিষ্পত্তির হার, গ্রেপ্তার, তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের কার্যক্রমের মতো সূচক বিবেচনা করা প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া প্রতিদিন কত মানুষ খুন হচ্ছেন বা কত অপরাধ বাড়ছে—এমন নির্দিষ্ট দাবি করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

অপরাধ দমনে সরকারের দৃঢ়তা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই দৃঢ়তা যেন আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। সরকারপ্রধানকে প্রতিটি ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হলে কিংবা প্রতিটি সমস্যার সমাধান ব্যক্তিগত নির্দেশনার ওপর নির্ভর করলে প্রশাসনিক কাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নিজের ক্ষমতা ও দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করবে, অনিয়মের জন্য জবাবদিহি করবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে আইন প্রয়োগ করবে।

এ ক্ষেত্রে পুলিশ, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার পরিচয়ের বদলে অপরাধের প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এত বড় বাজেটের কার্যকারিতা বিচার করতে হলে শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দেখলে চলবে না; দেখতে হবে অর্থের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ, প্রকল্প কতটা সময়মতো শেষ হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কতটা সেবা পাচ্ছে।

গ্রামীণ সড়ক, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ, পানি নিষ্কাশন কিংবা স্থানীয় অবকাঠামোর দুর্বলতা অনেক সময় উন্নয়ন ব্যয়ের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানোর ঘাটতি প্রকাশ করে। প্রকল্প গ্রহণের পর কাজের মান যাচাই, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে বড় বাজেটও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে না।

এ জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। কোন এলাকায় কোন সেবা সবচেয়ে জরুরি, কোথায় অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি এবং কোন প্রকল্পে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। উন্নয়নের হিসাব শুধু কত টাকা খরচ হলো, তা দিয়ে নয়; মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো, তা দিয়ে করতে হবে।

সরকারের আট মাসের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত বাজার তদারকির পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা ও বাজার কারসাজির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের অভিযোগ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সময়সীমাসহ পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। চতুর্থত, সরকারি ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি, কাজের মান এবং জনসাধারণের প্রাপ্ত সুবিধা সম্পর্কে সহজে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা উচিত। পঞ্চমত, মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভুল সিদ্ধান্ত বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা আড়াল না করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সরকারের আট মাসের মূল্যায়ন কোনো চূড়ান্ত রায় নয়; বরং ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা। এ সময়ে সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত, মন্ত্রিসভার পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক বিতর্ক আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এসব ঘটনার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে। জনগণ শুধু কঠোর বক্তব্য বা দৃশ্যমান অভিযান দেখতে চায় না; তারা তার ফল দেখতে চায়। বাজারে স্বস্তি, নিরাপদ জীবন, নিরবচ্ছিন্ন জনসেবা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আইনের সমান প্রয়োগ—এসবই একটি সরকারের প্রতি আস্থা তৈরির ভিত্তি। বিপুল জনসমর্থন সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক শক্তি, একই সঙ্গে বড় দায়িত্বও। সেই সমর্থন ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ জনতুষ্টির জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া নয়; বরং সমস্যার স্থায়ী সমাধান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আট মাস পেরিয়ে সরকারের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পাদক

Abdur Rahman

একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা
জনপ্রিয়

এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিন

জনপ্রতিনিধিদের চারটি গুণের অধিকারী হতে হবে

আট মাসে সরকারের পরীক্ষা

জনস্বস্তি ও সুশাসনই হোক সাফল্যের মাপকাঠি

প্রকাশ 07:47:32 pm, Wednesday, 21 October 2026

মন্ত্রিসভায় পদত্যাগ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ এবং নিত্যপণ্যের চাপে সরকারের সামনে এখন জনআস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ

একটি নির্বাচিত সরকারের সাফল্য শুধু নির্বাচনে পাওয়া আসনসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। জনগণের দৈনন্দিন জীবনে কতটা স্বস্তি ফিরেছে, আইনের শাসন কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে—এসবই সরকারের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের আট মাস পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাই প্রশ্ন উঠছে, মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কতটা এগিয়েছে? সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিসভা থেকে কয়েকজনের বিদায়, মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক, দ্রব্যমূল্যের চাপ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে সরকারের সামনে জনআস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে আট মাসের মূল্যায়ন করতে হলে বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে সরকারের নীতি, কার্যক্রম ও বাস্তব ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে।

সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভা থেকে জহির উদ্দিন স্বপন, দীপেন দেওয়ান ও ইশরাক হোসেনের বিদায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। তাঁদের বিদায়ের প্রেক্ষাপট অবশ্য এক নয়। ইশরাক হোসেন মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে উপস্থিত হওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার মুখে ১৯ অক্টোবর ২০২৬ প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন। পরদিন তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এর আগে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন স্বপন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানও মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান।

ইশরাকের ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মাদক নির্মূল নিঃসন্দেহে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিও আইনসম্মত হতে হবে। একজন জনপ্রতিনিধি কিংবা মন্ত্রী অপরাধ দমনে উদ্যোগী হতে পারেন, প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সক্রিয় করার দাবি জানাতে পারেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার দৃশ্য জনমনে ভীতি তৈরি করতে পারে এবং আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছিল।

এখানে মূল প্রশ্ন শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ নয়; বরং রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কার, জনপ্রতিনিধির ক্ষমতার সীমা কোথায় এবং অভিযোগ উঠলে তার নিষ্পত্তি কীভাবে হবে। জনরোষের মুখে কাউকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না তার নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা—সবকিছুই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হওয়া দরকার। একইভাবে, মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের বিদায়ের কারণ ও প্রেক্ষাপটও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। সরকার চাইলে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করতে পারে, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি অস্পষ্ট থাকলে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের সাফল্য অনেক সময় খুব সরল কয়েকটি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যাচ্ছে কি না, মাসের আয় দিয়ে সংসার চলছে কি না, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক কি না এবং পরিবার নিয়ে নিরাপদে থাকা যাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও পণ্যের দাম আগের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। তাই শুধু মূল্যস্ফীতির একটি পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের দুর্ভোগের পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম, পরিবারের আয় এবং ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সরকারের দায়িত্ব বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি, কারসাজি কিংবা প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। বাজারে নিয়মিত অভিযান চালানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ফলাফল—পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে কি না, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কমেছে কি না এবং সাধারণ মানুষ বাস্তবে উপকৃত হচ্ছে কি না।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আবাসিক গ্রাহকের ভোগান্তির পাশাপাশি উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ে। সমস্যা কোথায়—উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ, অবকাঠামো, নাকি ব্যবস্থাপনায়—তা চিহ্নিত করে সরকারকে সময়বদ্ধ পরিকল্পনা নিতে হবে। পরিকল্পনা ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরাও প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা কিংবা অন্যান্য অপরাধের ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা জনআস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অপরাধ পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। অপরাধের ধরন, সময়ভিত্তিক তুলনামূলক পরিসংখ্যান, মামলা নিষ্পত্তির হার, গ্রেপ্তার, তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের কার্যক্রমের মতো সূচক বিবেচনা করা প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া প্রতিদিন কত মানুষ খুন হচ্ছেন বা কত অপরাধ বাড়ছে—এমন নির্দিষ্ট দাবি করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

অপরাধ দমনে সরকারের দৃঢ়তা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই দৃঢ়তা যেন আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। সরকারপ্রধানকে প্রতিটি ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হলে কিংবা প্রতিটি সমস্যার সমাধান ব্যক্তিগত নির্দেশনার ওপর নির্ভর করলে প্রশাসনিক কাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নিজের ক্ষমতা ও দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করবে, অনিয়মের জন্য জবাবদিহি করবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে আইন প্রয়োগ করবে।

এ ক্ষেত্রে পুলিশ, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার পরিচয়ের বদলে অপরাধের প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এত বড় বাজেটের কার্যকারিতা বিচার করতে হলে শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দেখলে চলবে না; দেখতে হবে অর্থের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ, প্রকল্প কতটা সময়মতো শেষ হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কতটা সেবা পাচ্ছে।

গ্রামীণ সড়ক, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ, পানি নিষ্কাশন কিংবা স্থানীয় অবকাঠামোর দুর্বলতা অনেক সময় উন্নয়ন ব্যয়ের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানোর ঘাটতি প্রকাশ করে। প্রকল্প গ্রহণের পর কাজের মান যাচাই, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে বড় বাজেটও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে না।

এ জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। কোন এলাকায় কোন সেবা সবচেয়ে জরুরি, কোথায় অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি এবং কোন প্রকল্পে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। উন্নয়নের হিসাব শুধু কত টাকা খরচ হলো, তা দিয়ে নয়; মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো, তা দিয়ে করতে হবে।

সরকারের আট মাসের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত বাজার তদারকির পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা ও বাজার কারসাজির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের অভিযোগ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সময়সীমাসহ পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। চতুর্থত, সরকারি ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি, কাজের মান এবং জনসাধারণের প্রাপ্ত সুবিধা সম্পর্কে সহজে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা উচিত। পঞ্চমত, মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভুল সিদ্ধান্ত বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা আড়াল না করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সরকারের আট মাসের মূল্যায়ন কোনো চূড়ান্ত রায় নয়; বরং ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা। এ সময়ে সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত, মন্ত্রিসভার পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক বিতর্ক আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এসব ঘটনার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে। জনগণ শুধু কঠোর বক্তব্য বা দৃশ্যমান অভিযান দেখতে চায় না; তারা তার ফল দেখতে চায়। বাজারে স্বস্তি, নিরাপদ জীবন, নিরবচ্ছিন্ন জনসেবা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আইনের সমান প্রয়োগ—এসবই একটি সরকারের প্রতি আস্থা তৈরির ভিত্তি। বিপুল জনসমর্থন সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক শক্তি, একই সঙ্গে বড় দায়িত্বও। সেই সমর্থন ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ জনতুষ্টির জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া নয়; বরং সমস্যার স্থায়ী সমাধান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আট মাস পেরিয়ে সরকারের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।